মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

অ্যাপলের নতুন সিইও জন টার্নাসের সামনে যে বড় চ্যালেঞ্জ

অ্যাপলের নতুন সিইও জন টার্নাসের সামনে যে বড় চ্যালেঞ্জ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

অ্যাপলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের সময় এসেছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আইফোন ইভেন্টে নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছেন জন টার্নাস। এক দশকেরও বেশি সময় পর এবার অ্যাপলের নতুন পণ্য উন্মোচনের মঞ্চে নেতৃত্বে থাকছেন না টিম কুক।

হার্ডওয়্যার প্রকৌশলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টার্নাসের কাছে এখন অ্যাপলের পরবর্তী যুগের উদ্ভাবন নিয়ে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নতুন পণ্য উদ্ভাবন, মেমোরির বাড়তি খরচ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিয়ন্ত্রক চাপ সামলানো তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

এআইয়ে পিছিয়ে পড়া কাটানো

গত দুই বছর ধরে অ্যাপলের এআই কৌশল নিয়ে সমালোচনা চলছে। নতুন সংস্করণের সিরি চালুর পরিকল্পনাও গত বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছর এটি চালুর কথা রয়েছে।

প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডিপওয়াটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার জিন মুনস্টারের মতে, সিরি নিয়ে অ্যাপল গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ হারিয়েছে। তবে তার ধারণা, প্রতিষ্ঠানটি এখন সঠিক পথে এগোচ্ছে।

নতুন সিরি আইফোনে থাকা টেক্সট মেসেজ, ছবি ও অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর প্রশ্নের ব্যক্তিগতকৃত উত্তর দিতে পারবে। নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপে কাজ সম্পন্ন করা এবং ফোনের পর্দায় কী দেখা যাচ্ছে, সে বিষয়েও প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে।

গুগলের জেমিনির সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই উদ্যোগ অ্যাপলকে সহায়তা করতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের (আইডিসি) জ্যেষ্ঠ পরিচালক নাবিলা পোপালের মতে, ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার প্রতি অ্যাপলের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব এবং আইওএসের ক্যামেরা ও মেসেজের মতো ফিচারে সরাসরি এআই যুক্ত করার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে।

নতুন জনপ্রিয় পণ্যের চাপ

টার্নাসের ওপর আরেকটি বড় প্রত্যাশা হলো নতুন কোনো ‘হিট’ পণ্য বাজারে আনা। টিম কুকের নেতৃত্বে আইফোন অ্যাপলের কয়েক শ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে অ্যাপল মিউজিক, অ্যাপল কার্ড, অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডসের মতো পণ্য ও সেবাও যুক্ত হয়েছে।

এখন বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকেরা টার্নাসের নেতৃত্বে নতুন পণ্যে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখতে চাইছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো ফোল্ডেবল আইফোন।

আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ফোল্ডেবল ফোনের বাজারের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দখল করতে পারে অ্যাপল। তবে এই প্রযুক্তিতে স্যামসাং ও চীনা নির্মাতা হুয়াওয়ের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে।

মেমোরির বাড়তি খরচ

বিশ্বজুড়ে চলমান মেমোরি সংকটও টার্নাসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ডেটা সেন্টারে মেমোরির চাহিদা দ্রুত বাড়ায় এর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন খরচে।

অ্যাপল, নিনটেন্ডো ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। গত জুলাইয়ে অ্যাপল আইপ্যাড, ম্যাকসহ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ালেও আইফোনের দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল।

সিইও হিসেবে নিজের শেষ আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় টিম কুকও মেমোরির দামের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকইনসাইটসের মেমোরি কভারেজ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক হাওয়ার্ডের মতে, মুনাফার হার ধরে রাখতে আইফোনের দাম ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০ ডলারের পরিবর্তে ১ হাজার ৫০০ ডলারের আইফোনের বাজার তৈরি হতে পারে।

ইউরোপের নিয়ন্ত্রক চাপ

অ্যাপলের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা হতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিয়ন্ত্রক নীতি। ইইউর নিয়ম মেনে অ্যাপল সম্প্রতি অ্যাপ স্টোরের ব্যবসায়িক শর্তে পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে নতুন সিরি আইফোন ও আইপ্যাডে চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপ অ্যাপলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। ইউরোপীয় কমিশন অ্যাপল ও গুগলের অপারেটিং সিস্টেমে তৃতীয় পক্ষের এআই সহকারীদের আরও বেশি প্রবেশাধিকার দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে অ্যাপল ও গুগলের যুক্তি, তৃতীয় পক্ষের এআই সহকারীদের ফোনের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কুকের সাফল্য ধরে রেখে নতুনত্বের চ্যালেঞ্জ

সব মিলিয়ে টার্নাসকে একই সঙ্গে দুটি বড় দায়িত্ব সামলাতে হবে। একদিকে টিম কুকের সময়ে গড়ে ওঠা অ্যাপলের বিশাল ও লাভজনক ব্যবসার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে প্রযুক্তির নতুন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষক ওয়ামসি মোহনের মতে, শুধু আগের পণ্যগুলোর ধারাবাহিক উন্নতি করে অ্যাপলের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন হতে পারে।

টার্নাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই শুধু নতুন আইফোন বা অন্য কোনো পণ্য বাজারে আনা নয়। বরং কুকের গড়ে তোলা লাভজনক ব্যবসার কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে অ্যাপলের সেই প্রযুক্তিগত বিস্ময়ের অনুভূতি ফিরিয়ে আনা—যা প্রতিষ্ঠানটিকে দীর্ঘদিন ধরে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন