সামান্য টাকায় মিলছে সিডিআর-লোকেশন-এনআইডি

নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে এর ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। কল ডিটেল রেকর্ড (সিডিআর), মোবাইল ফোনের অবস্থান বা ‘লাইন লোকেশন’, জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য, এসএমএস তালিকা, পাসপোর্ট, টিআইএনসহ নানা ধরনের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে বলে উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে এক মাসে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ৬০০টির বেশি ফেসবুক পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এসব পোস্টের সূত্র ধরে নাগরিকদের তথ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধানও পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তিনজন বিক্রেতার কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে সিডিআর, সাম্প্রতিক অবস্থানের তথ্য ও এনআইডি-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে বিক্রেতাদের সরবরাহ করা তথ্য সঠিক পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১ হাজার ৫০ টাকায় তিন মাসের কল রেকর্ড
একটি মোবাইল নম্বরের তিন মাসের কল ডিটেল রেকর্ড পেতে ১ হাজার ৫০ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থ পরিশোধের প্রায় আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ওই তথ্য সরবরাহ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরবরাহ করা ফাইলে সর্বশেষ ২০টি যোগাযোগের নম্বর, কলের সময় এবং কলের ধরন ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত কল ইতিহাসের সঙ্গে যাচাই করে এসব তথ্যের মিল পাওয়া যায়।
সিডিআর ফাইলে কল শুরুর সময়, উভয় পক্ষের মোবাইল নম্বর, কলের স্থায়িত্ব, কলের ধরন, নেটওয়ার্ক, টাওয়ার ও সেল আইডি, আইএমইআই, আইএমএসআই এবং ঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্য থাকার কথাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এমনকি একজন ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে কোন কোন এলাকায় ছিলেন, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
১ হাজার ৫০০ টাকায় মোবাইলের অবস্থান
ব্যক্তিগত তথ্যের এই বাণিজ্যে শুধু কল রেকর্ডই নয়, মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যও বিক্রি হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।
একটি মোবাইল নম্বরের সাম্প্রতিক অবস্থানের তথ্য পেতে ১ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করা হয়। অর্থ দেওয়ার প্রায় ১৬ মিনিটের মধ্যেই তথ্য সরবরাহ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোবাইল টাওয়ার ও নেটওয়ার্ক সেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে একজন ব্যক্তির চলাচলের ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে এ ধরনের তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে গেলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
৫০০ টাকায় এনআইডির তথ্য
অনুসন্ধানে মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে একটি মোবাইল নম্বরের সঙ্গে যুক্ত এনআইডির পিডিএফ কপি পাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি নিয়ে মোবাইল নম্বর সরবরাহ করার পর মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যে নথিটি দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
নথিতে থাকা নাম, ছবি ও জন্মতারিখসহ বিভিন্ন তথ্য সংশ্লিষ্ট সিমের প্রকৃত মালিকের তথ্যের সঙ্গে যাচাই করা হয়। এমনকি সম্প্রতি সংশোধন করা ব্যক্তির মায়ের নামও সরবরাহ করা নথিতে হালনাগাদ ছিল বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।
যে তথ্যগুলো বিক্রি হচ্ছে
অনুসন্ধানে পাওয়া বিক্রয়তালিকায় এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, টিআইএন, কল ডিটেল রেকর্ড, মোবাইল লোকেশন, এসএমএস তালিকা, আইএমইআই, পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদসহ বিভিন্ন তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।
একটি ওয়েবসাইটে তিন মাসের কল তালিকার মূল্য ৯০০ টাকা, ছয় মাসের জন্য ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ‘লাইভ লোকেশন’-এর মূল্য ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই তালিকায় এনআইডি, টিআইএন এবং বিকাশ ও নগদ হিসাবসংক্রান্ত তথ্যেরও মূল্য উল্লেখ ছিল।
কয়েক বছর ধরে চলছে বেচাকেনা
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান বলছে, অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্যের এই বেচাকেনা নতুন নয়। অন্তত তিন বছর ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এক মাসে ৬০৫টি ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির হালনাগাদ বা প্রায় তাৎক্ষণিক অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কারও সম্পৃক্ততা কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গোপনীয়তা ও নিরাপত্তায় বড় হুমকি
একজন ব্যক্তি কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন এবং কতক্ষণ কথা বলেছেন—এসব তথ্য সিডিআর থেকে জানা সম্ভব। একই সঙ্গে টাওয়ার ও সেলসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ব্যক্তি কোন এলাকায় ছিলেন, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে এনআইডির পূর্ণাঙ্গ তথ্য অন্যের হাতে গেলে পরিচয় জালিয়াতি, ভুয়া হিসাব খোলা কিংবা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কল রেকর্ড ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের অপব্যবহার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে।
অপারেটরদের বক্তব্য
গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন। তাদের বক্তব্য, আইন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিদের কাছেই গ্রাহকের তথ্য সরবরাহ করা হয়।
রবি আজিয়াটার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, আইন অনুযায়ী অনুমোদিত সরকারি সংস্থাগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিডিআর, সিম নিবন্ধন ও লোকেশনসংক্রান্ত তথ্য পেতে পারে।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে জাতীয় টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) এ ধরনের তথ্য বিক্রির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। ওই চিঠিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ৭৮৯টি গ্রুপে নাগরিকদের এনআইডি ও কল রেকর্ড বিক্রির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকার কথা, তা যদি অল্প টাকার বিনিময়ে অনলাইনে কেনাবেচা হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু তথ্য ফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, নজরদারি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মতো গুরুতর ঝুঁকি।
তাই অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির উৎস শনাক্ত করার পাশাপাশি এসব তথ্য কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং তথ্য সুরক্ষার কোথায় দুর্বলতা রয়েছে—তা দ্রুত খুঁজে বের করা জরুরি।