ভর্তুকির সার যাচ্ছে মিয়ানমারে, দুই মাসে জব্দ ৩ হাজার ৩১০ বস্তা

সরকারের ভর্তুকিতে কৃষকদের জন্য সরবরাহ করা ইউরিয়া ও ডিএপি সার অবৈধভাবে সাগরপথে মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। গত ছয় মাসে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া সারের একাধিক চালান জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। এর মধ্যে শুধু জুলাই ও আগস্ট মাসেই আটটি চালানে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এসব চালানের মধ্যে জুলাইয়ে পাঁচটি এবং আগস্টে তিনটি চালান আটক করা হয়। জব্দ করা সারের মধ্যে ৭০০ বস্তা ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), আর বাকি ২ হাজার ৬১০ বস্তা ইউরিয়া সার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা সার ছোট-বড় নৌযানে করে উপকূলীয় রুট ব্যবহার করে মিয়ানমারে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী উপকূল ও সাগরপথকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্র এসব পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল ও অভিযানে একের পর এক চালান ধরা পড়লেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এই অবৈধ বাণিজ্য। সার পাচারের পাশাপাশি সিমেন্টসহ অন্যান্য পণ্যও মিয়ানমারে পাঠানোর চেষ্টা হচ্ছে।
সর্বশেষ ৩১ আগস্ট রাত ১টার দিকে কোস্ট গার্ড স্টেশন ভাটিয়ারীর উদ্যোগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় একটি কার্গো বোটে তল্লাশি করে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়।
কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে নৌযানে থাকা পাচারকারীরা পালিয়ে যায়। জব্দ করা সারের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বলে জানিয়েছেন কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন।
এর আগে ২৭ আগস্ট পতেঙ্গা এলাকায় পৃথক অভিযানে দুটি কার্গো বোট থেকে ২৮০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ১ হাজার বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়।
১৬ আগস্ট কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার দক্ষিণ কুতুবদিয়া চ্যানেলে একটি ফিশিং বোট থেকে ৬০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ২৫০ বস্তা সিমেন্ট উদ্ধার করে কোস্ট গার্ড। এসব পণ্যও মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল বলে জানায় সংস্থাটি।
জুলাই মাসেও সাগরপথে সার ও অন্যান্য পণ্য পাচারের একাধিক ঘটনা শনাক্ত হয়। ৩১ জুলাই পতেঙ্গা এলাকায় দুটি ফিশিং বোটে তল্লাশি চালিয়ে ৪৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ সময় ২৩ জনকে আটক করা হয়।
২৮ জুলাই নোয়াখালীর ভাসানচরের মাংগুরিয়ার চরসংলগ্ন এলাকায় একটি কার্গো বোট থেকে ৪৮০ বস্তা ইউরিয়া সার উদ্ধার করা হয়। একই নৌযান থেকে ৩ হাজার ৭০০ কেজি ছোলা ও ৬ হাজার ৮৫০ কেজি বুটের ডালও জব্দ করা হয়।
২৪ জুলাই রাতে সীতাকুণ্ডের সন্দ্বীপ চ্যানেলসংলগ্ন এলাকায় একটি ফিশিং বোট ও একটি কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ৩৮০ বস্তা সার ও ২৪০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় ১০ জনকে আটক করা হয়।
এর আগে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে তিনটি কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ২৫০ বস্তা ডিএপি সারসহ ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ২২ জনকে আটক করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য পাচারের পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ বিভিন্ন মাদক দেশে ঢোকার জন্যও একাধিক রুট ব্যবহার করা হচ্ছে। সাগরের পাশাপাশি নদীপথ ও স্থলসীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টেও চোরাচালানের তৎপরতা রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, নদী, সাগর ও স্থলপথের একাধিক পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করছে। সাগরপথে মাদক ও অন্যান্য চোরাচালান ঠেকাতে কোস্ট গার্ড কাজ করছে। স্থল ও সড়কপথে মাদক প্রতিরোধে বিজিবি, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্ব পালন করছে।
টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর গত মে মাসে স্থলবন্দরটি পুনরায় চালু হয়েছে। বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি ও আমদানি হলেও সার বা সিমেন্ট বৈধভাবে রপ্তানি হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, সরকার ইউরিয়া ও ডিএপিসহ চার ধরনের সারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে থাকে। কোস্ট গার্ডের অভিযানে সার জব্দের খবর তারা বিভিন্ন সময়ে পেলেও এসব সার ঠিক কোথা থেকে পাচারের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
তার ভাষ্য, চট্টগ্রামের কোনো ডিলার পয়েন্ট থেকে এসব সার মিয়ানমারে পাচার হওয়ার তথ্য কৃষি বিভাগের কাছে নেই। সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টগুলো নিয়মিত তদারকির আওতায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাংলাদেশে ভর্তুকির কারণে সারের দাম তুলনামূলক কম। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতে একই ধরনের সারের দাম বেশি হওয়ায় চোরাকারবারিরা অবৈধভাবে সার পাচারে উৎসাহিত হচ্ছে। ফলে কৃষকের জন্য নির্ধারিত ভর্তুকির সার কীভাবে সরবরাহব্যবস্থা থেকে বের হয়ে পাচারকারীদের হাতে যাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।