বিদেশি বিনিয়োগে লালদিয়া টার্মিনালের নির্মাণ শুরু, বাড়বে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা

চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এ প্রকল্পে ৭৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দেশের বন্দর ও লজিস্টিক খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
গত রোববার লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালুর পর ৩০ বছর পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
৭৬ কোটি ডলারের বিনিয়োগ
কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে লালদিয়া চর এলাকায় টার্মিনালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের জন্য ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের চুক্তি হয়। পরে গত ২২ এপ্রিল প্রকল্পের জমি প্রতিষ্ঠানটির কাছে হস্তান্তর করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
প্রথমদিকে প্রকল্পটিতে ৫৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা জানানো হলেও পরে তা বেড়ে ৭৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই অর্থে টার্মিনাল অবকাঠামোর পাশাপাশি আধুনিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। টার্মিনালে প্রায় ৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি থাকবে, যার মধ্যে থাকবে সাতটি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন। যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ বিদ্যুৎচালিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বছরে বাড়বে ৯ লাখ টিইইউএস সক্ষমতা
লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রকল্পটির বার্ষিক সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টিইইউএস। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউএস। নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে তা বেড়ে প্রায় ৪৪ লাখ টিইইউএস হতে পারে।
গত অর্থবছর ২০২৫-২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। ফলে নতুন টার্মিনাল ভবিষ্যতে বাড়তি চাপ সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।
বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা
লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম সুবিধা এর ভৌগোলিক অবস্থান। এটি কর্ণফুলী নদীর গুপ্ত বাঁকের আগে এবং সাগর থেকে তুলনামূলক কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। ফলে বড় জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বিদ্যমান টার্মিনালের তুলনায় সুবিধা পাওয়া যাবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নকশা অনুযায়ী, প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের সর্বোচ্চ প্রায় ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। একই সঙ্গে তুলনামূলক ছোট তিনটি জাহাজ অথবা দুটি বড় জাহাজ জেটিতে অবস্থান করতে পারবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে প্রায় সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের এবং সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৮০০ টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনটি ব্লকে হবে টার্মিনাল
প্রকল্পের মোট ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ৩২ একর জায়গায় মূল টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। আরও ৭ দশমিক ১৫ একর এলাকায় কনটেইনার ইয়ার্ড এবং প্রায় ১০ একর জায়গায় ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা রাখা হবে।
প্রকল্পটি ডিজাইন, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও হস্তান্তর—ডিবিএফওটি ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চুক্তির মোট মেয়াদ ৩৩ বছর। এর মধ্যে তিন বছর নির্মাণ এবং ৩০ বছর পরিচালনার জন্য নির্ধারিত।
বন্দর কর্তৃপক্ষের আয়ও বাড়বে
লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সরাসরি অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না। বরং টার্মিনাল পরিচালনার মাধ্যমে নির্ধারিত হারে রাজস্ব পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চুক্তি অনুযায়ী, বছরে প্রথম ৮ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রতিটি কনটেইনারে ২১ ডলার করে পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারের জন্য পাওয়া যাবে ২৩ ডলার। এ ছাড়া টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ২৫০ কোটি টাকা ফি পাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রত্যাশা
বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, লালদিয়া টার্মিনালের সবচেয়ে বড় সুবিধা শুধু রাজস্ব আয় নয়; বরং বন্দরের সক্ষমতা ও সেবার মানে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড়। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালও বর্তমানে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
নতুন টার্মিনাল চালু হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনে আরও দক্ষতা আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হওয়ার সম্ভাবনা
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ একটি বড় মাইলফলক। চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের একটি লজিস্টিক হাবে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকও বিদেশি বিনিয়োগের এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে গ্রিনফিল্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় দেশের জন্য এটি গর্বের বিষয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়ত হামিম বলেন, লালদিয়া হবে চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল। তাঁর মতে, নতুন এই টার্মিনাল চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন একটি মাইলফলক তৈরি হবে।