শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • পল্লবীতে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি, গ্রেপ্তার ১৩ বরিশালে সমকাল কার্যালয় থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আজ থেকে ডিএনসিসির বাড়ি বাড়ি অভিযান আজ থেকে দেশজুড়ে তিন মাসের ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান মিমি চক্রবর্তীর বিয়ের গুঞ্জন, পাত্র নৌবাহিনীর কর্মকর্তা দুই দিনের ব্যবধানে কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কমেছে ২১৫৮ টাকা সালাহউদ্দিন-মঈন খানের ওপর বাড়ল সংসদীয় দায়িত্ব আহত ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিনকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রগতি, সৌদি আরব ঘিরে বাড়ছে নতুন উদ্বেগ পাকিস্তানের টেস্ট পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন, ‘অসম্মান করছে ক্রিকেটকে’
  • ১৮৫ দেশ পেরিয়ে নাজমুন নাহার, লাল-সবুজের পতাকায় সাহসের বিশ্বজয়

    ১৮৫ দেশ পেরিয়ে নাজমুন নাহার, লাল-সবুজের পতাকায় সাহসের বিশ্বজয়
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের অনন্য মাইলফলক অর্জন করেছেন পরিব্রাজক নাজমুন নাহার। গত ৭ আগস্ট ভুটান সফরের মধ্য দিয়ে তার বিশ্বভ্রমণের দেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮৫-তে। দীর্ঘ ২৬ বছরের একক অভিযাত্রায় তিনি পৃথিবীর নানা প্রান্তে বাংলাদেশের পতাকা বহন করে তুলে ধরেছেন দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্বাধীনতার চেতনা ও মানবিকতার বার্তা।

    নাজমুন নাহারের এই পথচলা কেবল দেশ ভ্রমণের পরিসংখ্যান নয়। পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি, সমুদ্র, দুর্গম সীমান্ত, দ্বীপ ও ঐতিহাসিক স্থাপনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বহন ও উত্তোলন করেছেন। প্রতিটি অভিযাত্রায় তার সঙ্গে ছিল দেশের পরিচয়কে বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয়।

    nazmun

    শৈশবের কৌতূহল থেকেই বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন

    লক্ষ্মীপুরে বেড়ে ওঠা নাজমুন নাহারের ছোটবেলা থেকেই পৃথিবী, প্রকৃতি ও অজানাকে জানার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। বাবা মোহাম্মদ আমিন ও মা তাহেরা আমিন তাকে বই পড়ার প্রতি উৎসাহিত করতেন। বিভিন্ন দেশের গল্প ও বইয়ের মাধ্যমে ছোটবেলাতেই তার কল্পনার জগৎ ছড়িয়ে পড়ে দেশের সীমানার বাইরে।

    তার দাদা আহমদ উল্লাহও ছিলেন ভ্রমণপিপাসু ও জ্ঞানী ব্যক্তি। ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত তিনি আরব ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন। দাদার অভিজ্ঞতা, পরিবারের মূল্যবোধ এবং বইয়ের জ্ঞান নাজমুনের ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করে।

    উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বিশ্বকে জানার চেষ্টা

    বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেও এগিয়ে গেছেন নাজমুন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর স্কলারশিপ নিয়ে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে মানবাধিকার ও এশিয়া বিষয়ে উচ্চতর একটি স্কলারশিপ প্রোগ্রামে অংশ নেন।

    এ ছাড়া সুইডেনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছয়টি প্রফেশনাল ডিপ্লোমা অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেনে ‘সেকেন্ড জেনারেশন বাই কালচারালিজম’ বিষয়ে তার একাডেমিক গবেষণার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। গবেষক হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার ভ্রমণকে শুধু পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও সমৃদ্ধ করেছে।

    ২০০০ সালে শুরু আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা

    নাজমুন নাহারের আন্তর্জাতিক অভিযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা ২০০০ সালে। ভারতের পাঁচমারিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রামে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার দীর্ঘ পথচলা।

    তার কাছে ভ্রমণ কখনোই কেবল নতুন জায়গা দেখা নয়। প্রতিটি দেশ ও জনপদে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরাই ছিল তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সময়ের সঙ্গে তার অভিযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শান্তি, মানবাধিকার, পরিবেশ ও শিশু অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

    ‘নো ওয়ার, অনলি পিস’, ‘সেভ দ্য প্ল্যানেট’ এবং ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’-এর মতো বার্তা নিয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কথা বলেছেন। বিভিন্ন দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথাও তুলে ধরেছেন।

    nazmun

    ১০০ দেশের পর এবার ১৮৫

    ২০১৮ সালের ১ জুন জিম্বাবুয়েতে পৌঁছে নাজমুন নাহার তার বিশ্বভ্রমণের ১০০তম দেশের মাইলফলক অর্জন করেন। জাম্বিয়া থেকে স্থলপথে জিম্বাবুয়েতে প্রবেশ করে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তিনি।

    এরপরও থামেনি তার পথচলা। চলতি বছরের ৭ আগস্ট হিমালয়ের কোলে ভুটানে বাংলাদেশের পতাকা হাতে পৌঁছে ১৮৫তম দেশের মাইলফলক অর্জন করেন। ভুটানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির মধ্যে লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে তার ২৬ বছরের অভিযাত্রায় যুক্ত হয় নতুন এক অধ্যায়।

    প্রতিটি মাইলফলকের পেছনে ছিল ঝুঁকি

    ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। কোস্টারিকার তামারিন্ডো অঞ্চলে নদীর প্রবল স্রোতে আটকা পড়ে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েছিলেন তিনি। গুয়াতেমালায় অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীদের মুখোমুখি হয়েও রক্ষা পান।

    পেরুর প্রায় ১৪ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতার রেইনবো মাউন্টেনে গিয়ে তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। আফ্রিকার গিনি-কোনাক্রির দুর্গম জঙ্গলে প্রায় আড়াই দিন খাবার ছাড়া আটকা থাকার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।

    ইথিওপিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কঠিন পরিবেশের মধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে কাঁচা গরুর মাংস খাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডা যাওয়ার পথে বাস দুর্ঘটনার পর বৃষ্টির মধ্যে জঙ্গলে আটকা পড়েছেন।

    কঙ্গোর উবিরা অঞ্চলে অপহরণের পরিস্থিতি থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অপহরণের আশঙ্কায় ছিলেন। ভেনেজুয়েলায় কঠোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও পুলিশের বাধার মধ্যেও চালিয়ে গেছেন যাত্রা। কখনো দুর্গম পথে দিক হারিয়েছেন, কখনো গভীর রাতে সীমান্ত পেরিয়েছেন। বুরকিনা ফাসোর পথে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অভিবাসন দপ্তরে আটকে থাকার ঘটনাও রয়েছে তার অভিজ্ঞতার তালিকায়।

    ১৮৫ দেশে পা রেখেছেন নাজমুন, ছিল ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি

    ভ্রমণের সঙ্গে ছড়িয়েছেন শান্তি ও মানবিকতার বার্তা

    নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভ্রমণের সঙ্গে মানবিক বার্তা যুক্ত করা। বিশ্বের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে তিনি তরুণদের বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি সাহস, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন।

    যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘সাফার ফর পিস’-এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের শিশুদের সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। একই সঙ্গে পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা, নারী ও শিশুর অধিকার এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মতো বিষয়েও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেছেন।

    অর্জন করেছেন বহু সম্মাননা

    দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ ও মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে নাজমুন নাহার দেশ-বিদেশে ৭০টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন।

    ২০১৮ সালে জাম্বিয়ার পক্ষ থেকে তাকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পান ‘পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড’। ২০২৩ সালে সেন্ট লুসিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ জোসেফ পিয়ের তাকে ‘ব্রেভ গার্ল’ উপাধিতে সম্মানিত করেন।

    বিভিন্ন দেশের সরকার, মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও তার এই অভিযাত্রাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। পাপুয়া নিউগিনি, মালদ্বীপ, দক্ষিণ সুদান, অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া ও বাহামাসের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ও যোগাযোগও বিশ্বভ্রমণের আন্তর্জাতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।

    ১৮৫ দেশের পরও শেষ নয় পথচলা

    ভুটানে ১৮৫তম দেশের মাইলফলক অর্জন নাজমুন নাহারের দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে তার ভ্রমণের দর্শন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীকে জানার কৌতূহল, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকারই তার পথচলার মূল শক্তি।

    ২৬ বছরের এই অভিযাত্রায় তিনি শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করেননি; বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের কথা। দুর্গম পথ, ভয়, ঝুঁকি ও প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তার এগিয়ে চলা বাংলাদেশের নারীশক্তি ও অদম্য সাহসেরও একটি অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ।

    নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের ছবি, নথি ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলাদেশের এই অনন্য অভিযাত্রার ইতিহাস জানতে পারবে। তার ১৮৫ দেশের পথচলা তাই শুধু একজন পরিব্রাজকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে পৃথিবীর পথে লেখা বাংলাদেশের এক অনুপ্রেরণার গল্প।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    আরও পড়ুন