প্যারাসিটামলসহ যেসব ওষুধ ও সাপ্লিমেন্টে ক্ষতির ঝুঁকি লিভারের

লিভারের ক্ষতির কথা উঠলে অনেকেরই প্রথমে অ্যালকোহলের কথা মনে আসে। কিন্তু অ্যালকোহল ছাড়াও কিছু ওষুধ ও খাদ্য-সাপ্লিমেন্ট অতিরিক্ত বা ভুলভাবে ব্যবহারে লিভারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া, নির্ধারিত মাত্রার বেশি গ্রহণ করা কিংবা একই উপাদান থাকা একাধিক ওষুধ একসঙ্গে নেওয়া ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্টের কারণে লিভারে যে ক্ষতি হয়, তাকে বলা হয় ‘ড্রাগ-ইনডিউসড লিভার ইনজুরি’ বা ডিআইএলআই। এ ধরনের ক্ষতি অনেক সময় শুরুতে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ ছাড়াই হতে পারে। ফলে সতর্ক না হলে সমস্যা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বিষয়টি ধরা পড়তে পারে।
প্যারাসিটামলে কেন সতর্কতা জরুরি
জ্বর ও বিভিন্ন ধরনের ব্যথায় বহুল ব্যবহৃত ওষুধ প্যারাসিটামল। নির্ধারিত মাত্রায় এটি সাধারণত নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে লিভার ফেইলিওরও হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সর্দি-কাশি, ঠান্ডা বা ফ্লুর কিছু ওষুধেও প্যারাসিটামল থাকতে পারে। ফলে কেউ আলাদাভাবে প্যারাসিটামল খাওয়ার পাশাপাশি একই উপাদানযুক্ত আরেকটি ওষুধ গ্রহণ করলে অজান্তেই মোট মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
তাই যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে এর উপাদান ও নির্ধারিত মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
‘হার্বাল’ মানেই নিরাপদ নয়
প্রাকৃতিক, ভেষজ বা হার্বাল পণ্যকে অনেকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করেন। বাস্তবে কিছু হার্বাল পণ্য ও ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টও লিভারের ক্ষতি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব গুরুতর হয়ে তীব্র লিভার ফেইলিওরের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে বিভিন্ন ভিটামিন, মিনারেল, হার্বাল পণ্য বা ‘ইমিউনিটি বুস্টার’ নিজের ইচ্ছায় নিয়মিত গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। এসব পণ্যের উপাদান ও মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে একাধিক সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে গ্রহণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
একাধিক ওষুধে বাড়তে পারে ঝুঁকি
একই সময়ে মাথাব্যথার জন্য একটি ওষুধ, সর্দি-কাশির জন্য আরেকটি ওষুধ এবং স্বাস্থ্য বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে প্রতিটি পণ্য আলাদাভাবে নিরাপদ মনে হতে পারে। কিন্তু সেগুলোর উপাদান পরস্পরের সঙ্গে মিলে গেলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই চিকিৎসকের কাছে গেলে শুধু প্রেসক্রিপশনে থাকা ওষুধের তথ্য দিলেই হবে না। নিজের থেকে কেনা ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ, ভিটামিন, মিনারেল এবং হার্বাল সাপ্লিমেন্টের কথাও জানানো উচিত।
যে লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না
ওষুধজনিত লিভারের ক্ষতির শুরুতে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি, ক্ষুধামন্দা কিংবা পেটে অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
অবস্থা গুরুতর হলে প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া কিংবা মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এমন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লিভার ভালো রাখতে যা করবেন
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওষুধ খাবেন না।
- একই উপাদান একাধিক ওষুধে রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।
- নিয়মিত গ্রহণ করা ওষুধ, ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টের তালিকা সংরক্ষণ করুন।
- নতুন কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।
- ভুল করে অতিরিক্ত ওষুধ খেয়ে ফেললে বিষয়টি গোপন না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- ওষুধ খাওয়ার পর অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা করবেন না।
ওষুধ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে রোগ নিরাময় ও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ভুল মাত্রা, একই উপাদানের একাধিক ওষুধ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারে লিভারের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। তাই নিজের ইচ্ছায় ওষুধ না খেয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।