বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

তীব্র গরমে দীর্ঘ লোডশেডিং, অচল গ্রামীণ জনজীবন

তীব্র গরমে দীর্ঘ লোডশেডিং, অচল গ্রামীণ জনজীবন
ছবি : সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও তীব্র হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দিনে-রাতে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। জেলা ও উপজেলা শহরের বাসিন্দারাও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভোগান্তিতে পড়েছেন। গত সোমবার ও মঙ্গলবার দেশের অন্তত ২০টি জেলার খোঁজ নিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। সোমবার ১৬ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট। একই দিন বেলা ১টায় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। কোথাও কোথাও হাসপাতাল ও জরুরি সেবাতেও এর প্রভাব পড়ছে।

জেলায় জেলায় বিদ্যুৎ সংকট

রাজশাহী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, বাগেরহাট, নাটোর, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, ভোলা, চাঁদপুর, ফরিদপুর, যশোর, ঝিনাইদহ, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন।

সিলেটে সোমবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রায় চার ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত রোববার তাঁদের এলাকায় ১৫ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকায় কয়েক দিন ধরে গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ১৯ ঘণ্টার মধ্যে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলার গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে।

পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা ও কুয়াকাটা এলাকায় একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টার আগে ফিরে না আসার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। রাঙ্গাবালীর কয়েকটি এলাকায় রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না।

মাদারীপুরেও দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ সংকটে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীদের বসে থাকতে হচ্ছে।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

ফকিরহাট উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২২ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১০ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। সেখানে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর এক ঘণ্টা লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

লালমনিরহাটের আদিতমারীতে রাতে ১৫ থেকে ১৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে।

পটুয়াখালীতে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মাদারীপুরেও চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কম পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা।

বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি

দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভও হয়েছে। বরিশাল নগরীতে লোডশেডিং বন্ধ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে বাসদ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।

নীলফামারীতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়।

সিলেটের টুকের বাজার ও খাদিমপাড়া এলাকায় লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সংকটের কারণ জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানিয়েছেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও প্রত্যাশিত উৎপাদন হচ্ছে না।

তিনি জানান, ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও অতিবৃষ্টির কারণে মজুত কয়লা ভিজে যাওয়ায় উৎপাদন একপর্যায়ে প্রায় ৬০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে। এ ছাড়া আরএনপিসিএলের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা নামাতে বিলম্ব হওয়ায় উৎপাদনে সমস্যা হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গ্যাসের সরবরাহ ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্রসহ দেশের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরানোর চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান আশা করছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে গরমের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠতে পারে ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় বর্তমানে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি চাহিদাও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন