রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপিদের ভোট হবে স্বচ্ছ ব্যালটে

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একাধিক প্রার্থী থাকায় আগামী ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও আর কখনো ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একজন প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত বলে জানা গেছে। ফলে এবার দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তপশিল অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। পরে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করা হয়।
১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরোক্ষ ভোটের বিধান চালু হয়। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমানে সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালের অক্টোবরে বিএনপি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। আওয়ামী লীগ প্রার্থী করে সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। ওই নির্বাচনে দুই প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন এবং সংসদ সদস্যদের ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
এরপর ১৯৯৬ সালে শাহাবুদ্দিন আহমেদ, ২০০১ সালে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ২০০২ সালে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, ২০০৯ সালে জিল্লুর রহমান, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে আবদুল হামিদ এবং ২০২৩ সালে মো. সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নির্বাচন
গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করায় দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটি শূন্য হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন নির্ধারণ করেছে।
তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।
তবে যাচাই-বাছাই শেষে যদি একজন বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। সেক্ষেত্রে তাকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
কীভাবে হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচনি কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সমর্থক হতে হবে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর সম্মতিসূচক বিবৃতিও দিতে হবে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যরা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট দেবেন। ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা প্রকাশ্যেই অনুষ্ঠিত হবে।
দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমানসংখ্যক সর্বোচ্চ ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করা হবে। নির্বাচনি কর্তার ঘোষিত ফলাফলই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে।
এ ছাড়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে যে যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধান রয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীকেও তা পূরণ করতে হয়। কোনো ব্যক্তি আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হলে, দেউলিয়া হয়ে দায়মুক্ত না হলে, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা আনুগত্য স্বীকার করলে কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের ফৌজদারি দণ্ডের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারবেন না।
এ ছাড়া লাভজনক সরকারি পদে থাকা বা আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অযোগ্য কোনো ব্যক্তিও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন না।
এবার কেন গুরুত্বপূর্ণ
দীর্ঘ সময় পর এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরই স্পষ্ট হবে, শেষ পর্যন্ত কতজন প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাঠে থাকছেন। একাধিক প্রার্থী বহাল থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে ভোটের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।