১ জুলাইয়ের আন্দোলন থেকে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান: যেভাবে শুরু হয়েছিল ‘জুলাইয়ের যাত্রা’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার টানা আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তবে সেই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল আরও এক মাস আগে, ১ জুলাই। সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে ওই দিন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের সংগঠিত আন্দোলন, যা পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ের গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
কোটা রায়কে ঘিরেই আন্দোলনের সূত্রপাত
২০১৮ সালে ব্যাপক আন্দোলনের পর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিল সরকার। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সেই পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়। এই রায়ের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন।
৫ থেকে ৯ জুন পর্যন্ত বিক্ষোভ চলার পর শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেন। দাবি পূরণে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না আসায় ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে কর্মসূচি শুরু হয়।
দেশজুড়ে একযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্তত ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে বের হওয়া মিছিল ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমাবেশে মিলিত হয়।
শিক্ষার্থীদের স্লোগানে উঠে আসে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, সমান সুযোগ এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের দাবি। আন্দোলনের সংগঠকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ১ জুলাই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে একই প্ল্যাটফর্মে আনার লক্ষ্য সফল হয়।
ঢাকার বাইরে আন্দোলনের বিস্তার
একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।
কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
চার দফা দাবি ঘোষণা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—
- ২০১৮ সালের কোটা বাতিল সংক্রান্ত সরকারি পরিপত্র বহাল রাখা।
- স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে অযৌক্তিক কোটা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা।
- সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য সীমিত কোটা রাখা।
- দ্রুত স্থায়ী ও আইনগত সমাধান নিশ্চিত করা।
এ সময় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাধান না এলে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং শাহবাগ অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি পালন করা হবে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জোরালো হলেও সে সময় সরকার বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করেনি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আন্দোলন নিয়ে তেমন কোনো ইতিবাচক বার্তা আসেনি। বরং আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে বিরোধী দলকে সমালোচনা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতেই আন্দোলনের গুরুত্ব অনুধাবন না করায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে তা জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
ইতিহাসে ১ জুলাইয়ের গুরুত্ব
পর্যবেক্ষকদের মতে, ১ জুলাইয়ের আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি রাষ্ট্রে সমতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। পরবর্তী এক মাসে আন্দোলনের বিস্তার ঘটে এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তা নতুন অধ্যায়ে পৌঁছায়। এ কারণে ২০২৪ সালের ১ জুলাইকে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সূত্র: সারাবাংলা