মেসির রেকর্ডে উজ্জ্বল আর্জেন্টিনা, শতভাগ জয় নিয়ে নকআউটে

বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে লিওনেল মেসিকে বিশ্রাম দিয়ে শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। নকআউট নিশ্চিত থাকায় কোচ লিওনেল স্কালোনি নিয়মিত অধিনায়ককে শুরুর একাদশে রাখেননি। তবে বেঞ্চে থেকেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মেসি। শেষ পর্যন্ত বদলি হিসেবে নেমে গোল করে আবারও ইতিহাস গড়েছেন তিনি।
রোববার (২৮ জুন) ডালাস স্টেডিয়ামে জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপপর্বে টানা তিন জয় তুলে নেয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শতভাগ সাফল্য নিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে উঠলেও ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল মেসির রেকর্ডগড়া গোল।
নকআউট নিশ্চিত থাকায় স্কালোনি আগের ম্যাচের তুলনায় একাদশে নয়টি পরিবর্তন আনেন। তবুও শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। ষষ্ঠ মিনিটে জিওভানি লো সেলসোর গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও ১৯ মিনিটে তিনি ফ্রি-কিক থেকে দারুণ এক গোলে দলকে এগিয়ে দেন।
এরপর ৩১ মিনিটে ভিএআরের সহায়তায় পাওয়া পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লাউতারো মার্টিনেজ। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার প্রথম গোল। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।

দ্বিতীয়ার্ধে ৫৫ মিনিটে মুসা আল-তামারির গোলে ব্যবধান কমায় জর্ডান। এতে কিছুটা চাপে পড়ে আর্জেন্টিনা। এরপর ম্যাচের ৬০ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন লিওনেল মেসি। তার মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই স্টেডিয়ামজুড়ে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
ম্যাচের ৮০ মিনিটে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে পাওয়া ফ্রি-কিক দারুণ নিচু শটে জালে পাঠান মেসি। গোলরক্ষক ইয়াজিদ আবুলাইলা ভুল দিকে ঝাঁপ দেওয়ায় বলের নাগাল পাননি। এই গোলেই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার জয়।
মেসির নতুন দুই বিশ্বরেকর্ড
জর্ডানের বিপক্ষে করা গোলটি মেসিকে এনে দিয়েছে দুটি অনন্য বিশ্বরেকর্ড। বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়ে ইতিহাসের একক শীর্ষে উঠেছেন তিনি। এর আগে টানা ছয় ম্যাচে গোল করে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জাইরজিনহো।
একই সঙ্গে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ১৯-এ উন্নীত করেছেন মেসি, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এবারের বিশ্বকাপে এটি তার ষষ্ঠ গোল। এর আগে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি।
আরও যেসব রেকর্ড গড়েছে আর্জেন্টিনা
মেসির ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দল হিসেবেও একাধিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের এক আসরের গ্রুপপর্বে ছয় গোল করা মাত্র পঞ্চম ফুটবলার হয়েছেন মেসি।
গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপে সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে দুটি গোল করা ষষ্ঠ খেলোয়াড় তিনি।
বিশ্বকাপে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়ে, যা গত ছয় দশকের সর্বোচ্চ।
একটি বিশ্বকাপ ম্যাচে একাধিক সরাসরি ফ্রি-কিক গোল করা গত ৬০ বছরে মাত্র চতুর্থ দল আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপে পঞ্চমবারের মতো গ্রুপপর্বে টানা তিন ম্যাচ জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা।
২০২২ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে টানা নয় ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে দলটি।
লাউতারো ও পারেদেসের বিশেষ অর্জন
লাউতারো মার্টিনেজ বিশ্বকাপে নিজের নবম ম্যাচে প্রথম গোলের দেখা পেয়েছেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি তার ৩৮তম গোল, যা তাকে দেশের ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে তুলেছে।
অন্যদিকে লিয়ান্দ্রো পারেদেস জর্ডানের বিপক্ষে ১৫৪টি সফল পাস সম্পন্ন করেন। গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে কোনো আর্জেন্টাইন ফুটবলারের এটি সর্বোচ্চ সফল পাসের রেকর্ড।
সামনে কেপ ভার্দে, তবে আছে এক অস্বস্তিকর ইতিহাস
গ্রুপপর্বে শতভাগ সাফল্য নিয়ে নকআউটে উঠলেও আর্জেন্টিনাকে ভাবাচ্ছে একটি পুরোনো পরিসংখ্যান। এর আগে ১৯৩০, ১৯৯৮, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের সব ম্যাচ জিতেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি তারা।
এবারও তিন ম্যাচে তিন জয় নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে স্কালোনির দল। আগামী ৪ জুলাই মায়ামিতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচ জিতলে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে ইতিহাস বদলের স্বপ্ন আরও জোরালো হবে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নকআউটে এগিয়ে যাওয়া নয়, বরং গ্রুপপর্বের শতভাগ সাফল্যকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপায় রূপ দেওয়া। আর মেসি যেন প্রতিটি ম্যাচেই প্রমাণ করে চলেছেন—বয়স বাড়লেও ইতিহাস লেখার ক্ষুধা এখনো অটুট।