বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানেও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বজায় রেখেছে ব্রাজিল

ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানেও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বজায় রেখেছে ব্রাজিল
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা/ ছবি: এক্স (সাবেক টুইটার) থেকে সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি পরিস্থিতিকে ‘পরিকল্পিত গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি, নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

২০২৫ সালে ফ্রান্স সফরের সময়ও লুলা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের বিশেষ উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম জানিয়েছেন, ব্রাজিল ইসরায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি পুনর্বিবেচনা করছে, বিশেষ করে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তার যুক্তি, এমন সিদ্ধান্ত ইসরায়েলে থাকা ব্রাজিলীয় নাগরিকদের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এই অবস্থানের বিরোধিতা করছেন কিছু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। সাও পাওলোর পন্টিফিকাল ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রুনো হুবারম্যানের মতে, কনস্যুলার সেবা চাইলে তা রামাল্লাহ ও পূর্ব জেরুজালেমের মাধ্যমে বিকল্পভাবে পরিচালনা করা সম্ভব, যেখানে ব্রাজিল ইতোমধ্যেই সেবা দিয়ে আসছে।

অন্যদিকে অধ্যাপক ব্রুনো লিমা রোচা মনে করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পেছনে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার মতে, দেশটিতে এখন জায়নবাদপন্থী ও ইভানজেলিক্যাল মতাদর্শের প্রভাব আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

তিনি আরও বলেন, অনেক আরব ও মুসলিম দেশও বাস্তবে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, ফলে ব্রাজিলের অবস্থানও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এদিকে ব্রাজিলের নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের দাবি জানাচ্ছে। তাদের মতে, গাজায় সহিংসতা বন্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি, বন্ধ করা উচিত।

গত ১৫ জুন ব্রাজিলের একাধিক শহরে এ দাবিতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রাজিলের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছিল। ওই বছর ব্রাজিল ৭২৫.১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং ১.১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৪২৫.৭ মিলিয়ন ডলার।

রপ্তানির মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল জ্বালানি তেল (৩০ শতাংশ), এরপর গরুর মাংস (২৩ শতাংশ) ও সয়াবিন (১১ শতাংশ)। আমদানির ক্ষেত্রে প্রধান ছিল কীটনাশক, জৈব ও রাসায়নিক সার।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়েও বাণিজ্য ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে, যেখানে আমদানি রপ্তানির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্পর্ক ছিন্ন করলে দুই দেশের ওপর প্রভাব ভিন্ন হবে। ব্রাজিল তুলনামূলকভাবে সহজেই নতুন বাজার খুঁজে নিতে পারলেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের নির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাণিজ্যের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও রয়েছে, যা ২০২২ সালে একটি পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে আরও সম্প্রসারিত হয়।

অন্যদিকে ২০২৪ সালে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ব্রাজিল ইসরায়েল থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়, এবং বর্তমানে তেল আবিবে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের পদ শূন্য রয়েছে।

সব মিলিয়ে গাজা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ব্রাজিলের নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা তৈরি হয়েছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করছে।


সূত্র: ব্রাজিল দে ফাতো
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন