রাজস্বের টাকায় মোয়াজ্জেমের রাজপ্রাসাদ!

- # কাস্টমসে পোস্টিং বাণিজ্য আর চোরাচালান চক্রের অদৃশ্য হাত
- # হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার ও বেনামী সম্পদের ছড়াছড়ি
- # প্রকাশ্য অনুসন্ধানের মুখে প্রভাবশালী এই কর্মকর্তা
বাইরে সরকারের রাজস্ব রক্ষার দায়িত্ব, আর ভেতরে দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের আখের গোছানোর মহোৎসব! জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসন) মো: মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে শত কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য, কাস্টমসে শুল্ক ফাঁকি ও চোরাচালানের সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের ২০ পাতার এক গোপন অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এই কর্মকর্তার দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে এখনই ‘প্রকাশ্য অনুসন্ধান’ শুরু করার জন্য দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।
ভয় দেখিয়ে বদলি বাণিজ্য: কামিয়েছেন শত কোটি টাকা!
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জানা গেছে, মোয়াজ্জেম হোসেন কাস্টমসের প্রশাসন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই পোস্টিং নিয়ে একচেটিয়া বাণিজ্য শুরু করেন। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, মাঠ পর্যায়ের কমিশনারদের ভয় দেখিয়ে তিনি নিজের পছন্দের লোকদের বিভিন্ন লাভজনক দপ্তরে বসাতেন। এনবিআরের নিয়ম ভেঙে মাত্র ১৪ জন কর্মকর্তার বদলি থেকেই তিনি প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকা করে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এই ঘুষের টাকা লেনদেনের জন্য তাঁর একটি নিজস্ব সিন্ডিকেটও ছিল, যার অন্যতম সহযোগী কর্মকর্তা আইয়ুব আলীর বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও ডলারসহ ডিবির হাতে আটকের ঘটনাও ঘটেছে!
ব্যবসায়ীদের থেকে ‘ধার’ ও দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীর খাতির:
মোয়াজ্জেম হোসেন নিজের ক্ষমতা খাটিয়ে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা চেকের মাধ্যমে ‘ধার’ হিসেবে নিতেন। মেঘনা গ্রুপ ও দুদকের মামলায় জড়িত ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে মোট ৬০ লাখ টাকা ধার নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। দুদক বলছে, বড় ব্যবসায়ী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে এভাবে সুদমুক্ত টাকা নেওয়া সরাসরি অপরাধ এবং এগুলো আসলে ঘুষের টাকাই।
এছাড়াও বিগত সরকারের বিতর্কিত ও সাজাপ্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সাথে তাঁর গভীর সখ্যতা ছিল। মায়ার কোনো আত্মীয় না হয়েও মোয়াজ্জেম নিজেকে তাঁর আত্মীয় পরিচয় দিতেন এবং প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন শুল্ক ফাঁকির ফাইল ধামাচাপা দিতেন।
সরকারের সাড়ে ৩ কোটি টাকা গিলে খেলেন এক ফাইলেই!
ঢাকা কাস্টম হাউসে থাকাকালীন এই মোয়াজ্জেম হোসেন হংকং থেকে আনা ২ লক্ষ ১০ হাজার পিস নিষিদ্ধ মেমোরি কার্ট চোরাচালানের এক বড় চালান জালিয়াতির মাধ্যমে ছেড়ে দেন। যার কারণে সরকারের এক ফাইলেই প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়। এর আগে রাজশাহী ও যশোরে থাকার সময়ও বিড়ি ফ্যাক্টরিগুলোর শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে বিপুল অংকের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তাঁকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ বা তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছিল।
মোয়াজ্জেমের সম্পদের পাহাড়: স্ত্রী গৃহিণী, ছেলে পড়ে আমেরিকায়!
মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী একজন সাধারণ গৃহিণী হলেও তাঁর নামে রয়েছে বিপুল বেনামী সম্পত্তি। এই কর্মকর্তার চোখ ধাঁধানো সম্পদের যে খতিয়ান দুদকের হাতে এসেছে, তা দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!
আমেরিকায় আলিশান বাড়ি ও হুন্ডি:
মোয়াজ্জেমের ছেলে রাজীব আমেরিকার ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’তে প্রতি সেমিস্টারে ৩৫ হাজার ডলার খরচ করে পড়াশোনা করছেন। এই টাকার কোনো বৈধ উৎস নেই, সম্পূর্ণ টাকাই হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আমেরিকার বাল্টিমোরে ছেলে ও পুত্রবধূর নামে একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনা হয়েছে।
ফ্ল্যাট ও প্লটের ছড়াছড়ি:
ঢাকার ধানমন্ডি ও উত্তরায় দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া পূর্বাচলে দুটি প্লট, জলসিঁড়ি প্রকল্পে একটি প্লট এবং ডিওএইচএস-এ আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর। নিজের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে একটি বিশাল ৮ তলা বাড়ি বানিয়েছেন তিনি।
ব্যাংক ও শেয়ার বাজারে কোটি টাকা:
উত্তরা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকে তাঁর নামে থাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার রহস্যজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। আইডিএলসি-তে ২৫ লাখ টাকার শেয়ার ব্যবসাসহ সাভারের গ্রীণ ভ্যালি সোসাইটিতে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি।
দুদকের কঠোর অবস্থান:
দুদকের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নোয়াখালী সদরের বাসিন্দা মো: মোয়াজ্জেম হোসেনের (এনআইডি নম্বর- ৭৩২৮৭০৩১১৬৯৭৮) এই বিপুল সম্পত্তি কোনোভাবেই তাঁর সরকারি বেতনের আয়ের সাথে মেলে না। দেশের টাকা বিদেশে পাচার এবং এই বিশাল অবৈধ সম্পদের পেছনের আসল রহস্য বের করতে তাঁর বিরুদ্ধে দ্রুত প্রকাশ্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবী জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে মোয়াজ্জেম কে মুঠোফোনে তার অভিযোগ সম্পকি'ত তথ্য জানতে চাইলে, তিনি বলেন আমি কথা বলতে রাজি নই, মুঠোফোন রেখে দেন।
তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। বিস্তারিত ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।