দর্শকদের হাসি-কান্নার নাম সালাউদ্দিন লাভলু

বাংলা টেলিভিশনের সোনালী অতীতে একটা সময় ছিল, যখন গ্রামীণ পটভূমির নাটক মানেই ছিল গৎবাঁধা কিছু চরিত্র, চেনা সংলাপ আর অতি-সাধারণ উপস্থাপনা। কিন্তু সেই চেনা গ্রামবাংলাকে নতুন এক ভাষা, মাটির সোঁদা গন্ধ আর নিখাদ বিনোদনের রঙে সাজিয়ে দর্শকের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিয়েছিলেন একজন মানুষ— সালাউদ্দিন লাভলু। তিনি শুধু নাটক বানাননি, তিনি আসলে গ্রামীণ ও মফস্বল মানুষের জীবনের অবিকল গল্প বলেছেন। অতি সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, মান-অভিমান, প্রেম ও আনন্দ-বেদনাকে তিনি পর্দায় এমন জাদুকরী ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন, যার ভেতরে দর্শক নিজের জীবনটাই খুঁজে পেত।
প্রাইম টাইমের অঘোষিত সম্রাট এবং ‘লাভলু ঘরানা’
সালাউদ্দিন লাভলুর নাম শুনলেই নব্বই ও শূন্য দশকের দর্শকহৃদয়ে একের পর এক কালজয়ী নাটকের দৃশ্য ভেসে ওঠে। ‘রঙের মানুষ’, ‘ভবের হাট’, ‘ঘরকুটুম’, ‘সাকিন সারিসুরি’, ‘হাড়কিপ্টা’, ‘সার্ভিস হোল্ডার’, ‘আলতা সুন্দরী’ কিংবা ‘সোনার পাখি রূপার পাখি’— প্রতিটি নাটকই যেন ছিল এক একটি আলাদা জগৎ। টেলিভিশনের পর্দায় প্রাইম টাইমে সালাউদ্দিন লাভলুর নাটক মানেই ছিল পুরো পরিবারের একসাথে বসে পড়ার অঘোষিত গ্যারান্টি।
সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো, তাঁর নাটকে গ্রামের চরিত্রগুলো কখনো সস্তা কৌতুকের বস্তু হয়ে ওঠেনি; বরং তারা হয়ে উঠেছে রক্ত-মাংসের জীবন্ত ও বাস্তব মানুষ। তাঁর গল্পে অবলীলায় হাসি আসত, আবার সেই হাসির অন্তরালেই লুকিয়ে থাকত জীবনের কোনো গভীর সত্য।
ক্যামেরার পেছনের জাদুকর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনেতা
শুধু কমেডি বা ফ্যামিলি ড্রামাতেই নিজেকে আটকে রাখেননি এই গুণী নির্মাতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ভেঙেছেন, বদলেছেন গল্প বলার ধরনও। আজকাল তাকে ক্যামেরার পেছনের চেয়ে অভিনেতা হিসেবেই পর্দায় বেশি দেখা যায়। অভিনয়েও তিনি ঠিক ততটাই স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল, যতটা ক্যামেরার পেছনে নির্দেশক হিসেবে ছিলেন। তবে দর্শকের একটা বড় অংশ এখনো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে— আবার কবে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে মাঠে নামবেন সেই পুরোনো লাভলু? আবার কবে কোনো নতুন ‘ভবের হাট’ আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে?
লাভলুর নির্মাণে একটা উঠান, একটা কাঁচা রাস্তা, গ্রামের চায়ের দোকান কিংবা পরিবারের ছোট্ট ঝগড়াও অসাধারণ হয়ে উঠত। তাঁর ক্যামেরা শুধু দৃশ্য ধারণ করত না, মানুষের বিশুদ্ধ আবেগগুলোকেও ফ্রেমে বন্দি করে রাখত।
শুটিং ইউনিটের এক অনন্য ‘অভিভাবক’
কাজের বাইরে সালাউদ্দিন লাভলুর ব্যক্তিত্বের আরেকটি অসাধারণ দিক রয়েছে, যা মিডিয়াপাড়ায় রূপকথার মতো। তাঁর সঙ্গে কাজ করা প্রতিটি অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলী একবাক্যে স্বীকার করেন— সালাউদ্দিন লাভলু শুধু একজন পরিচালক নন, তিনি পুরো শুটিং ইউনিটের একজন ছায়াদানকারী অভিভাবক।
একজন প্রতিষ্ঠিত তারকা অভিনেতা থেকে শুরু করে সহকারী পরিচালক, চিত্রগ্রাহক, মেকআপ ম্যান, লাইটম্যান, ক্যামেরা সহকারী কিংবা ড্রাইভার— ইউনিটের সর্বকনিষ্ঠ মানুষেরও খোঁজ রাখেন তিনি। কার শরীর খারাপ, কে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকটে আছে— সবকিছু জেনে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। কাজের জায়গাকে একটি সুসংবদ্ধ পরিবারের মতো আগলে রাখার এই মায়া ও ভালোবাসার কারণেই ঢালিউড ও নাট্যপাড়ায় তিনি সবার ‘লাভলু ভাই’।
সরলতার মাঝে সততার জয়
সালাউদ্দিন লাভলুর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর গল্পের সততা। তিনি কখনো গল্পকে অযথা জটিল বা আধুনিকতার নামে কৃত্রিম করেননি। খুব সহজ ভাষায়, সহজ মানুষের গল্প বলেছেন বলেই তা বছরের পর বছর দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে।
বাংলা নাটকের ইতিহাসে অনেক কালজয়ী ও জনপ্রিয় নির্মাতা এসেছেন এবং আসবেন। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যারা দর্শকের হৃদয়ে এতটা গভীরভাবে এবং দীর্ঘসময় ধরে জায়গা করে নিতে পেরেছেন। সালাউদ্দিন লাভলু সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি শুধু নাটক নির্মাণ করেননি; বরং একটি সোনালী সময়, একটি সংস্কৃতি আর একটা অবিনশ্বর আবেগ তৈরি করেছেন। তাই তাকে শুধু পরিচালক বললে কম বলা হয়, তিনি আসলে বাংলা নাটকের নির্মাণের এক রাজপুত্র।