মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • মিরপুরে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে টেস্ট সিরিজে এগিয়ে বাংলাদেশ হাম আক্রান্ত হয়ে একদিনে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত, তীব্র নিন্দা ঢাকার পশুর হাটে নিরাপত্তায় আসছে হটলাইন ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিরপুর টেস্টে নাটকীয় মোড়, জয়ের খুব কাছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে আসার আহ্বান অস্ট্রেলিয়া সিরিজে বড় চমক: ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার’ হলে মিলবে গাড়ি মার্কেট খোলা রাখার সময়সীমা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত সিলেটেই হচ্ছে দ্বিতীয় টেস্ট, অপরিবর্তিত বাংলাদেশ স্কোয়াড ঘোষণা মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থার উন্নতি, ঈদের আগেই দেশে আনার চেষ্টা
  • চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে স্বর্ণ পাচার চক্র, গডফাদার সামাদ ধরাছোঁয়ার বাইরে

    চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে স্বর্ণ পাচার চক্র, গডফাদার সামাদ ধরাছোঁয়ার বাইরে
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যেও থেমে নেই চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে স্বর্ণ পাচার। পতিত আওয়ামীলীগ আমলে এ এলাকার স্বর্ণ চোরাচালান ছিল ওপেন সিক্রেট। সেসময় এদের মধ্যে কোনকারনে মতবিরোধ দেখা দিলে শেষপর্যন্ত তা খুনোখুনিতে রুপ নিতে দেখা গিয়েছে।

    নিজেদের মধ্যে অন্তকোন্দল প্রকাশ হয়ে পড়ায় এবং পথের কাটা মনে করে যুবলীগ নেতা পল্টুকে প্রকাশ্য দিবালোকে দর্শনা রেলইয়ার্ড এলাকায় খুন করা হয়।  সীমান্ত সংশ্লিষ্ট স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যরা এলাকায় এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা সবসময় থেকে যায় সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝে মধ্যে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে দু'একটি চালান ধরা পড়লেও এ ব্যবসার মূল হোতারা থেকে যায় অন্তরালে। কেবলমাত্র চালান বহনকারী স্থানীয় ভাষায় "জোন" বা কামলারাই ধরা পড়ে।

    এলাকার স্বর্ণ পাচারকারীদের দাপট সবথেকে বেশি দেখা যায়, দর্শনা পৌর এলাকার জয়নগর, শ্যামপুর, ঈশ্বরচন্দ্রপুর, দক্ষিণ চাঁদপুর, শ্যামপুর, মোবারক পাড়া, পাঠানপাড়া, রেলকলোনী, বেলেমাঠপাড়া এবং দামুড়হুদা উপজেলার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের পারকৃষ্ণপুর, সুলতানপুর, কামারপাড়া,বাড়াদী, নাস্তিপুর, ঝাঝাডাঙ্গা, ছোটবলদিয়া, বড়বলদিয়া, কুড়ুলগাছী ইউনিয়নের বুইছিতলা, ফুলবাড়ি, ঠাকুরপুর, কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের কুতুবপুর, মুন্সীপুর, বয়রা ইত্যাদি ভারত সীমান্তবর্তী এই সকল গ্ৰামে রয়েছে স্বর্ণ চোরাচালান ও পাচারকারীদের নিরাপদ আস্তানা বা অভয়ারণ্য।

    কয়েকজন চিহ্নিত গডফাদারের নেতৃত্বে পরিচালিত বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেটের কয়েকশ' সদস্য সক্রিয় রয়েছেন দুবাই থেকে অবৈধ ভাবে দেশে আসা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের বার ভারতে পাচার ও চোরাচালান কর্মকাণ্ডের সাথে। এর বিপরীতে ভারত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, স্বর্ণের গহনা, রৌপ্যের গহনা, হেরোইন, নেশাজাতীয় কয়েক প্রকারের ট্যাবলেট, ফেনসিডিল, ইয়াবা, মদ সহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য নিয়ে আসছে দেশে। বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি সহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সবসময় এসব অপকর্ম চলছে। এর ফলে মাদক সহজ লভ্য হয়ে উঠেছে। আর এ কারনে হাতের নাগালে মাদক পেয়ে এলাকার কিশোর ও যুবসমাজ ধ্বংসের পথে পতিত হচ্ছে। সেইসাথে পরিবার ও সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে চরম অস্থিরতা। 

    এই সকল স্বর্ণ ও মাদক পাচার চক্রের মূল হোতা "গডফাদার"  কামারপাড়ার সামাদ। তার নেতৃত্বে চলছে সোনা পাচার। কোনোভাবেই তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। বৈধ বা অবৈধভাবে দেশে আসা সোনার সম্ভাব্য গন্তব্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে। জনশ্রুতি রয়েছে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে সোনার চাহিদা হঠাৎ করেই বাড়তে থাকে। এরপর থেকেই চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে সোনা পাচারের ঘটনা বেড়ে যায় বহুগুণে। আবার অস্ত্র, মাদক ও হুন্ডির বিনিময় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই মূল্যবান ধাতুটি। উদ্বেগজনক হারে চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।


    চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের কিতাব আলী ছেলে সামাদ। দীর্ঘদিন ধরেই চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ চোরাকারবারি ও হুন্ডি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে সে। একাজে তার সহযোগী হিসাবে কাজ করছে এ এলাকার আরও কয়েকজন চিহ্নিত চোরাকারবারি।  বর্তমানে তার দুই স্ত্রীর নামে গ্ৰামে দুটি আলিশান বাড়ি রয়েছে।

    এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে আছে কোটি কোটি টাকা। রয়েছে দামি গাড়িও। এত গাড়ি-বাড়ি ও অর্থ যার তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা বা নেই কোন আয়ের উৎস। স্বর্ণ চোরাকারবারির 'গুরু' হিসেবে খ্যাত দেশ-বিদেশে চোরাচালানের  কাজ করেন সামাদ। ভারতের শীর্ষ চার স্বর্ণ চোরাকারবারির সঙ্গে তার রয়েছে দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতা। এক দশকের বেশি সময় ধরে সরাসরি স্বর্ণ চোরাকারবারিদের গডফাদার হিসেবে কাজ করলেও এর আগে রহস্যজনক ভাবে কখনও তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েননি। আর এখন পর্যন্ত সোনা চোরাচালানে জড়িত কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। কারণ সোনা চোরাচালানে শুধু বাহকরাই ধরা পড়ছেন, সামাদের মত মূল হোতারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

    অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতরা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা স্বর্ণ নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। মূলত ভারতে পাচারের জন্যই বাংলাদেশে এ স্বর্ণ চোরাচালান করে আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্বর্ণ চোরাচালান রুটের সবচেয়ে বড় করিডোরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত। দর্শনা থানাধীন এলাকায় সোনা ও মাদকদ্রব্যের বিনিময় বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠেছে। একদিকে পাচার হচ্ছে সোনা, অন্যদিকে দেশে ঢুকছে সর্বনাশা মাদকদ্রব্য। পাচারকারীরা নগদ লেনদেন এড়িয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে। 

    যথাযথভাবে এই অপতৎপরতা রুখতে না পারলে সামনের দিনগুলোয় তা আরো মারাত্মক রূপ নেয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। গডফাদার সামাদ স্বর্ণ চোরাচালানের কাজে এরই মধ্যে অবৈধ পথে অনেক বার ভারতে গেছেন। চোরাকারবারিদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন সামাদ। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ভারতের স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সদস্যদের। নামে-বেনামে বিভিন্ন মোবাইল সিম থেকে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক ও হুন্ডি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে সে।

    দর্শনা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারতে পাচার হয় এসব স্বর্ণ। প্রতি পিস স্বর্ণের বার ভারতে প্রবেশ করাতে পারলে পাচারকারীরা ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা পেয়ে থাকে। একই পন্থায় আবার ওপার থেকে মাদক নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। মাদকের ধরন ও আকারভেদে আলাদা কমিশন পেয়ে থাকে পাচারকারীরা।

    স্থানীয়দের অভিযোগ, কামারপাড়া গ্ৰামের কিতাব আলীর ছেলে স্বর্ণ ও মাদক কারবারি সামাদের কারণে রাত নামলেই অচেনা মানুষের আনাগোনা বাড়ে সীমান্ত এলাকায়। সীমান্ত দিয়ে আগে শুধু গরু বা বিভিন্ন পণ্য পাচার হয়ে আসতো। এখন মাদকই সবচেয়ে বেশি আসছে। শুধু এখানেই শেষ না সামাদ রাতে মদ খেয়ে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে বাইরে থেকে বিভিন্ন মেয়েদেরকে নিয়ে এসে একান্তে সময় কাটায়। স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে এর প্রভাব ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

    সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভারতে পাচারকালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন কামারপাড়া সীমান্ত থেকে ৩টি স্বর্ণের বারসহ আসমা খাতুন নামে এক নারী চোরাকারবারিকে আটক করে চুয়াডাঙ্গা- ৬ বিজিবি'র সদস্যরা। সামাদের ভাষ্যমতে ৩টি স্বর্ণের বার তার নিজের। 

    এরপর চলতি বছরের ১১ এপ্রিল দামুড়হুদা উপজেলার হৈবতপুর পাচকবর এলাকা থেকে পারকৃষ্ণপুর গ্ৰামের গোপাল হালদারের ছেলে সমর হালদারকে চার পিস স্বর্ণের বার সহ আটক করে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি'র বাড়াদী ক্যাম্পের জওয়ানরা। এর মাত্র এক দিন পর ১৩ এপ্রিল সকাল ছয়টার সময় দর্শনা পুরাতন রেলস্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি'র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসানের নেতৃত্বে বিজিবি'র বিশেষ টহলদল দর্শনা মোবারক পাড়ার মৃত বাদল খানের ছেলে আলমগীরকে ১০ পিস স্বর্ণের বারসহ আটক করে। গোপন সূত্রে পাওয়া এক  ভিডিওতে সামাদকে বলতে শোনা যায়, এসকল স্বর্ণের বার গুলি তার। এবং তার কাছে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলেও ঐ  ভিডিওতে তাকে বলতে দেখা যায়।

    এ ব্যাপারে অভিযুক্ত সামাদের বক্তব্য জানতে তার সাথে বেশ কয়েকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন লাইন কেটে দেন তিনি।

    চুয়াডাঙ্গা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ মো. হাশেম আলী বলেন, ‘সীমান্তে বিজিবির শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না। চোরাচালান নিরসনে সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা জরুরি।

    বিজিবির দেয়া তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ কোটি ৭০ লাখ ৩৬ টাকার মাদক জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে ১৮ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৪ টাকার স্বর্ণের বার জব্দ করে বিজিবি। এ বিষয়ে বিজিবি সূত্রে জানা যায়, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে তারা। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে স্বর্ণ জব্দ করা হচ্ছে। ফলে স্বর্ণ চোরাচালান আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে বিজিবির অভিযান চলমান রয়েছে।প্রতিনিয়ত মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হচ্ছে।

    আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সামাদ'কে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চাঞ্চল্যকর সব তথ্যসহ তার কাছে থাকা অস্ত্র ও গুলির সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। স্বর্ণ ও মাদক ব্যবসায়ী সামাদ চোরাচালানে জড়িত হয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে আগেই। বিষয়টির প্রতি সুনজর দিয়ে প্রযোজনীয় আইনগত ব্যাবস্থা নিতে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ও জেলা পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এলাকার সচেতন মহল।

    চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি'র অধিনায়ক ও পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, স্বর্ণ ও সবধরনের মাদকসহ চোরাচালানী পন্যের ব্যাপারে বিজিবি কঠোর ভাবে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে থাকে। আমাদের টহলদল ৬ বিজিবি'র আওতাধীন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অব্যাহতভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বর্ণ,মাদক সহ কোটি কোটি টাকার চোরাচালান পন্য জব্দ ও অসংখ্য চোরাকারবারি আটক করে চলতি বছরের এই ক'মাসেই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এব্যাপারে গডফাদার যারা আছেন তাদেরকে আটকের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ