ধরাছোঁয়ার বাইরে ‘জাদুর চেরাগ’ হাতে পাওয়া কাস্টমস কর্মকর্তা আরিফুল

কিশোরগঞ্জের এক সাধারণ স্কুলশিক্ষকের ছেলে তিনি। অথচ ২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসে যোগদানের পরই পাল্টে যায় তার জীবনের গতিপথ। তিনি কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় গড়া, অর্থপাচার এবং চারিত্রিক স্খলনের একের পর এক অভিযোগ উঠলেও উর্ধ্বতনদের ‘আশীর্বাদে’ তিনি বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সম্পদের পাহাড় ও রহস্যময় আয়কর নথি
আরিফুল ইসলামের আয়কর নথি বিশ্লেষণ করলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। নথিতে আংশিক তথ্য দিলেও রাজধানীর বুকে তার সম্পদের চিত্র ভয়াবহ:
- জমি ও ফ্ল্যাট: মিরপুর হাউজিংয়ে ফ্ল্যাট, পাইপাড়ায় জমি, উত্তর মেরাদিয়ায় প্লটসহ খিলগাঁওয়ের ৩ ও ৭৪ নং ওয়ার্ড এবং কাফরুলের ১৬ নং ওয়ার্ডে রয়েছে তার অঢেল সম্পত্তি।
- নগদ টাকা ও স্বর্ণ: আয়কর নথি অনুযায়ী তার ১ কোটি ৪৬ লাখ টাকার এফডিআর এবং ৫ বছরের সঞ্চয় ১০ লাখ টাকারও বেশি। এছাড়া তার সংগ্রহে রয়েছে অন্তত ৫৭ ভরি স্বর্ণ।
- কিশোরগঞ্জে সাম্রাজ্য: গ্রামে সাধারণ জীবন দেখালেও কিশোরগঞ্জে তার বাবার নামে রয়েছে বিশাল এক হার্ডওয়্যার দোকান, যা মূলত আরিফুলের কালো টাকার বিনিয়োগ বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুবাই কানেকশন ও স্ত্রীর সফর
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো আরিফুলের স্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণ। গত ৫ বছরে তিনি অন্তত ১০০ বার দুবাই সফর করেছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীর এই অস্বাভাবিক ভ্রমণ এবং দুবাইয়ে আরিফুলের গোপন ব্যবসার অভিযোগ সরাসরি অর্থপাচারের দিকে আঙুল তোলে।
দিনের বেলা সচিব, রাতে ‘প্লে-বয়’
আরিফুলের বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক নয়, উঠেছে ভয়াবহ নৈতিক স্খলনের অভিযোগ। জানা গেছে, তিনি প্রতি রাতে পূর্বাচল এলাকার বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লাবে মদ আর নারীদের নিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেন। এমনকি ব্যক্তিগত রিসোর্টে নারীদের নিয়ে সময় কাটানোই তার প্রধান নেশা। আড়ালে তিনি একজন ‘ধনকুবের লম্পট’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও দাপ্তরিক ক্ষমতায় তা ধামাচাপা দিয়ে রাখেন।
ছাত্রলীগের লেবাস ও ভোল পাল্টানো রাজনীতি
ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত আরিফুল বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সব চেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করেছেন। এনবিআরের বিতর্কিত কর্মকর্তা বেলাল হোসেন চৌধুরীর ‘ম্যান’ হিসেবে পরিচিত আরিফুলকে ঢাকা কাস্টম হাউসে অনিয়মের কারণে তিন মাসের মাথায় স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য শক্তিতে তিনি এখন কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে তিনি অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে নিজের ভোল পাল্টে ফেলেছেন।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া অভিযোগে আরিফুলের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি কোনো কোটায় চাকরি পেয়েছেন এবং তার দেওয়া তথ্যে কোনো জালিয়াতি আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
এইসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রমাণ থাকলে নিউজ করলে আপত্তি নাই। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আরো যাছাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করতে অনুরোধ করেন।
আগামী পর্বে পড়ুন: আরিফুলের দুবাই ব্যবসার চাঞ্চল্যকর নথিপত্র।