শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
Natun Kagoj

দুর্নীতির বরপুত্র যশোর ভ্যাট কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মারুফ!

দুর্নীতির বরপুত্র যশোর ভ্যাট কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মারুফ!
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে যেভাবে দুর্নীতি, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত হয়েছিলেন, যশোর ভ্যাট কমিশনারেটে যোগ দেওয়ার পরও ঠিক একই অভিযোগে আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছেন যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমান।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে যে অনিয়ম ও অবৈধ আয়ের অভিযোগ উঠেছিল, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি—বর্তমানে যশোর ভ্যাট কমিশনারেটেও সেই একই কৌশলে দুর্নীতির চক্র পরিচালনা করছেন তিনি।

ভুক্তভোগী মুজিবুর রহমান খান গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে মো. মারুফুর রহমানকে একজন পেশাদার ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, সরকারি দায়িত্বের আড়ালে থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং ভ্যাট সংশ্লিষ্ট অনিয়মের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

চট্টগ্রাম থেকে যশোর; দুর্নীতির একই ছক

চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট ইউনিট ও ফিল্ড পর্যায়ের কার্যক্রম কার্যত অচল করে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যশোর ভ্যাট কমিশনারেটের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মারুফুর রহমান বর্তমানে যশোরেও একই ধরনের চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ঘুষ বাণিজ্যের কৌশল অবলম্বন করছেন। তার নির্দেশ অমান্য করলে বদলি কিংবা চাকরি হারানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

অভিযোগ অনুযায়ী, মো. মারুফুর রহমান মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং যুবলীগের সদস্য ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখেছেন।

কিছু সূত্র আরও দাবি করে, বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এবং আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের নামে দলীয় তহবিলে শত কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

মারুফুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ জমা পড়লেও অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে সেগুলো তদন্তের আগেই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব প্রশাসনের দুর্নীতির ‘বরপুত্র’ হিসেবে টিকে আছেন বলে মন্তব্য অনেকের।

প্রশ্নফাঁস থেকে ভ্যাট ক্যাডার

অভিযোগে আরও বলা হয়, পিএসসির ড্রাইভার আবেদ আলীর কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকায় প্রশ্নপত্র কিনে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মারুফুর রহমান। পরবর্তীতে ভ্যাট ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা, বেনাপোল, চট্টগ্রাম এবং বর্তমানে যশোর ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে প্রতিটি পদকে তিনি অবৈধ আয়ের যন্ত্রে পরিণত করেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভ্যাটের অবৈধ আয় দিয়ে তিনি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বেতিলা-মিউরায় ২০০ কাঠা জমি, শিবালয় উপজেলায় ৫০ কাঠা জমি, নবগ্রাম, কৃষ্ণপুর, মহাবেদপুর ও ঘিওর এলাকায় প্রায় ৪০০ বিঘা জমি, ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘আই’ ব্লকে ২০ কাঠা জমি, পূর্বাচলের ১৩ নম্বর ব্লকে ৪ কাঠা জমি ক্রয় করেন।

এছাড়া ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে তিনটি সোনার দোকান এবং সেখান থেকে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জে ‘মারুফ এগ্রো ফার্ম’ নামে প্রায় ২০ কোটি টাকার একটি খামার, মানিকগঞ্জের ডেরা রিসোর্ট অ্যান্ড স্পায় বড় বিনিয়োগ রয়েছে। যাতায়াতের জন্য তিনি কোটি টাকা দামের টয়োটা ভেলফায়ার ও প্রিমিও গাড়ি ব্যবহার করেন। গুলশান ক্লাবের এক কোটি টাকার সদস্যপদ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তার প্রথম স্ত্রীর নামে ঢাকার খিলক্ষেতে ছয়টি ফ্ল্যাট ও দুটি হ্যারিয়ার গাড়ি এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে গুলশানে সাততলা বাড়ি, একটি সিআরভি গাড়ি, লন্ডন ও নিউইয়র্কে একাধিক বাড়ি ও গাড়ির মালিকানার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তিনি মাসে দুই লাখ টাকা করে মাসোহারা আদায় করতেন। ‘এআরও’ নাজমুল হাসানের মাধ্যমে ঘুষের লেনদেন পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে আদায়কৃত অর্থও শেষ পর্যন্ত তার কাছেই থেকে যায় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এ বিষয়ে যশোর ভ্যাট কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন