শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
Natun Kagoj
গুলিস্তান কি অরিয়ন গ্রুপের ব্যক্তিগত সম্পত্তি?

ফ্লাইওভারের নিচে সরকারি রাস্তা দখল করে আবাসিক এলাকা নির্মাণ

ফ্লাইওভারের নিচে সরকারি রাস্তা দখল করে আবাসিক এলাকা নির্মাণ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

রাজধানীর অতি ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তান। যেখানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, সেখানে সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের বিশাল জায়গা দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী 'অরিয়ন গ্রুপ'। ফ্লাইওভারের পিলারের মধ্যবর্তী সরকারি জমিতে স্থায়ী ও সেমি-পাকা ঘর নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করছে কোম্পানির স্টাফ ও শ্রমিকরা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া এই দখলদারিত্ব বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও বুক ফুলিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

​জনদুর্ভোগের চরম সীমা
​সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, গুলিস্তান পয়েন্টে ফ্লাইওভারের নিচের অংশে অরিয়ন গ্রুপ একের পর এক রুম তৈরি করেছে। ইটের দেয়াল এবং টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি এসব ঘরে থাকছেন গ্রুপটির কয়েকশ কর্মী। এই অবৈধ দখলের ফলে ওই এলাকার মূল রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে একদিকে যেমন দ্রুতগামী যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, অন্যদিকে সাধারণ পথচারীদের হাঁটার জায়গা না থাকায় প্রতিনিয়ত যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। ​গুলিস্তান এলাকার নিয়মিত পথচারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, এই দখলদারিত্বের কারণে পুরো এলাকাটি এখন অরিয়ন গ্রুপের ব্যক্তিগত ‘কলোনি’তে পরিণত হয়েছে। অথচ এই জায়গাটি জনগণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা ছিল।

​প্রশাসনের উদাসীনতা ও রহস্যময় নীরবতা
​এর আগে দেশের প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদপত্র এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘মাছরাঙা টিভি’-তে এই দখল নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সিটি কর্পোরেশন—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত এই স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি বেসরকারি কোম্পানি কীভাবে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের নিচে এভাবে আবাসন গড়ে তোলার সাহস পায়?

​ভুক্তভোগী ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
​গুলিস্তানের স্থানীয় ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ভেবেছিলাম সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু অরিয়ন গ্রুপের দাপট কমেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এই জায়গা দখল করেছিল। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তাদের এই দখল প্রক্রিয়া সমানে চলছে। মনে হচ্ছে গুলিস্তানের এই অংশের মালিক সরকার নয়, বরং অরিয়ন গ্রুপ। ​তিনি আরও জানান, ফ্লাইওভারের নিচের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘিঞ্জি পরিবেশের সুযোগ নিয়ে রাতে ছিনতাই ও অসামাজিক কার্যকলাপও বৃদ্ধি পেয়েছে।

​কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
​এই বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) রক্ষণাবেক্ষণ শাখার একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তারা কীভাবে এই জায়গার দখল নিয়েছে বা কোনো সমঝোতা হয়েছিল কি না, তা আমাদের নথিপত্রে স্পষ্ট নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা অবগত আছি। জনস্বার্থে অতি শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সাথে আলোচনা করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ​অন্যদিকে, অরিয়ন গ্রুপের স্থানীয় তদারকি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

​নাগরিক সমাজের দাবি
​পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা উন্মুক্ত রাখা নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য। সেখানে দাহ্য পদার্থ বা জনবসতি গড়ে তোলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ফ্লাইওভারের কাঠামোগত ক্ষতি হতে পারে। ​জনসাধারণের দাবি, অনতিবিলম্বে গুলিস্তানের এই সরকারি জমি থেকে অরিয়ন গ্রুপের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে রাস্তাটি দখলমুক্ত করা হোক এবং এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হোক।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন