মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

দখল-দূর্নীতির ছায়ায় আবুল খায়ের গ্রুপ: সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পদ বিপন্ন

দখল-দূর্নীতির ছায়ায় আবুল খায়ের গ্রুপ: সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পদ বিপন্ন
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবৈধ জমি দখল, সরকারি সম্পদের অনিয়মিত ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের উপর হুমকি-প্ররোচনার মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে আসছে। গ্রুপটির দখল ও দুর্নীতির কার্যক্রম শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক, পরিবেশগত ও মানবিক নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করছে। সূত্র, নথি, স্থানীয়দের সাক্ষ্য এবং সরকারি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেখা যায়, গ্রুপটি চট্টগ্রাম, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ এবং অন্যান্য অঞ্চলে সরকারি রাস্তা, নদীর তীর, হালট, পার্ক, মসজিদ ও মন্দিরের জমি দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় ১৯৫২ সালে বিড়ির ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু আবুল খায়ের গ্রুপ ধীরে ধীরে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপে পরিণত হয়। বর্তমানে এ গ্রুপের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছে স্টিল মিল, সিমেন্ট, সিরামিক, ঢেউটিন, দুধ, সিগারেট এবং নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পখাতে। তবে এই সফলতার আড়ালে রয়েছে দখল, লুটপাট, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং রাজস্ব ফাঁকি। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিবেদন ও স্থানীয়দের সাক্ষ্য অনুযায়ী, গ্রুপটি অবৈধভাবে জমি দখল এবং প্রশাসনের নজর এড়িয়ে নানা ধরনের অপরাধ চালিয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরে শাহ সিমেন্ট প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে স্থানীয় কৃষকদের জমি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে। এখানে কোম্পানির নিজস্ব জমি মাত্র ২০ বিঘা হলেও ৬০০ বিঘা জমি ব্যবহার করা হয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মাদামবিবির হাটে খাল ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ এবং গাজীপুরের কালীগঞ্জে সরকারি হালট, নদীর জমি, মসজিদ ও মন্দির দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা তৈরি করেছে গ্রুপটি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ইকো পার্কের জন্য নির্ধারিত সরকারি জমি দখল করে টিন ও ইট দিয়ে প্রাচীর নির্মাণ করে সেখানে পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধভাবে দখলকৃত জমিতে ফসলি জমি, গবাদিপশুর চলাচল এবং জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে গ্রুপের নিযুক্ত সন্ত্রাসী বাহিনী ও স্থানীয় থানার পুলিশ ব্যবহার করে হুমকি, মামলা এবং হামলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে দমন করা হয়। ২০১৮ সালে কালীগঞ্জে ৪০ জনের মতো স্থানীয় গ্রামবাসী ও আনসার সদস্যরা জমি উদ্ধারে অভিযানের সময় আহত হন। এসব ঘটনা দেখায় যে, গ্রুপের দখল ও প্রভাবশালী অবস্থার কারণে প্রশাসনিক পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে না।

গ্রুপের দখলের মধ্যে রয়েছে সরকারি, ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্থাপনা। বালীগাঁও কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে এবং বালীগাঁও জয়দেববাড়ী দুর্গা মন্দিরের পুকুরে পাইপলাইন স্থাপন ও বালু ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় মুসল্লি ও পূজা কমিটির অভিযোগ অনুযায়ী, বহুবার সালিশ ও দরবারের চেষ্টা করেও জমি উদ্ধার করা যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, এইসব অপরাধের কারণে ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব পড়েছে।

নদী এবং হালট দখলও গ্রুপের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের অংশ। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী সরকারি হালট দীর্ঘদিন ধরে দখল করা হয়েছে এবং নদীর পাশে স্থাপনা নির্মাণ করে স্থানীয় মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারি উচ্ছেদ অভিযান সত্ত্বেও পুনরায় দখল ও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক কর্তৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্টেও গ্রুপকে জরিমানা করা হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর হয়েছে সীমিত মাত্রায়।

জমি দখল, সরকারি সম্পদের অনিয়ম এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা ছাড়াও গ্রুপের আর্থিক কর্মকাণ্ডও সমস্যার সৃষ্টি করেছে। পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্রুপের কয়েকটি শিল্প খাতে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায়যোগ্য পাওনা গোপন করা হয়েছে এবং সরকারের কাছেও যথাযথ পরিশোধ হয়নি। ২০১৮ সালে গ্রাহক থেকে পাওনা অর্থ সংগ্রহে বাধা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিক্রয় বিভাগ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আইনি ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রুপের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। কালীগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আমজাদ হোসেন স্বপন প্রায় একাধিক জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগে জিডি করেছেন। আদালতের নির্দেশে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আবু সাঈদ চৌধুরী বাবুল এবং সিরামিক শাখার উপ-ব্যবস্থাপক মর্তুজা মাহফুজসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে বিচারিক কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন থাকায় দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে এখনও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ মাধ্যম এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদকরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনার পরিচালক আবুল হাশেম-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্যের জন্য চিঠি প্রদান করেছেন। দৈনিক নতুন কাগজ থেকে পাঠানো চিঠিতে দখল, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পার হওয়া সত্ত্বেও আবুল হাশেম কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। এই নিরবতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তুলেছে।

গ্রুপের কর্মকাণ্ড শুধু সরকারি ও ব্যক্তিগত জমি দখলেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় কৃষকদের পৈত্রিক জমি, হালট, পার্ক এবং নদী দখল করে তারা অবৈধভাবে ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জন করছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর হামলা এবং মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপের নিযুক্ত আনসার সদস্যরা অবৈধ স্থাপনার পাহারা দেয় এবং সাধারণ মানুষকে দূরে রাখে।

অভিযোগ ও প্রমাণের আলোকে দেখা যায় যে, আবুল খায়ের গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার দাপটে দখল ও দুর্নীতি চালিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উদাসীনতা এবং দেরিতে পদক্ষেপের কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি বেড়েছে। গ্রুপের কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়, বরং পরিবেশ, সামাজিক ও ধর্মীয় স্থাপনার উপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

গ্রুপের কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় মানুষের জীবিকা বিপন্ন হয়েছে। কৃষি নির্ভর গ্রামে ফসলি জমি দখল ও নদীর পানি ব্যবহার সীমিত হওয়ার কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত। মন্দির ও মসজিদের উপর স্থাপনা নির্মাণের কারণে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, প্রশাসনের কাছে বহুবার অভিযোগ করার পরও কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

গ্রুপের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তা। প্রতিবেদনে স্পষ্ট, যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পিছনে মেধা, পরিশ্রম ও দক্ষতার পাশাপাশি সামাজিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা অত্যন্ত জরুরি। যদি তা না থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক সফলতার আড়ালে স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশ বিপন্ন হতে পারে, যা আবুল খায়ের গ্রুপের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন