মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

বসতভিটার স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠে লড়ছেন ফুটবলযোদ্ধা প্রতিমা মুন্ডা

বসতভিটার স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠে লড়ছেন ফুটবলযোদ্ধা প্রতিমা মুন্ডা
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সবুজ মাঠে তিনি দুর্দান্ত ছুটে চলেন। বলের দখল নিতে লড়াই করেন অদম্য সাহসে। তার পায়ের জাদুতে অনেকবার জয় এসেছে বাংলাদেশের। তিনি প্রতিমা মুন্ডা—জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ নারী দলের ফুটবলার। দেশের পতাকা হাতে যখন মাঠে দাঁড়ান, দর্শকসারিতে উল্লাস ওঠে গৌরবে। কিন্তু সেই উল্লাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রতিমার জীবনের এক নির্মম সত্য—নিজস্ব কোনো ঘর নেই, নেই নিশ্চিন্ত আশ্রয়।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিষখালী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামে জন্ম প্রতিমার। বাবা শ্রীকান্ত মুন্ডা ইটভাটার শ্রমিক, মা সুমিতা মুন্ডা মৎস্য ঘেরের দিনমজুর। অভাব-অনটনের সংসারে প্রতিদিনই ছিল লড়াই। তবুও ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি অদম্য টান ছিল তার। স্থানীয় গাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় মাঠে প্রথম আলো ছড়ান তিনি। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা—ধাপে ধাপে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে পৌঁছে যান সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে।

সেখান থেকেই শুরু স্বপ্নপূরণের যাত্রা। কোচদের নজরে আসেন, ভর্তি হন বিকেএসপিতে। তারপর জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে জায়গা করে নেন। ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ একাধিক দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। মাঠে তার অবদানেই এসেছে বহু সাফল্য।

তবে প্রতিমার ঘরের গল্প একেবারেই ভিন্ন। মা সুমিতা মুন্ডা চোখ ভেজানো কণ্ঠে বললেন, “তিন বেলা ভাতের নিশ্চয়তা ছিল না। মেয়ের খরচ চালাতে অন্যের ঘেরে কাজ করেছি। ধারদেনা করে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এখনো প্রায় ৪৬ হাজার টাকার ঋণের বোঝা টানছি। প্রতিমার পড়াশোনা আর খেলাধুলা চালাতে বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাগে—আমাদের পক্ষে যা অসম্ভব।”

আইলার পর আশাশুনি থেকে খলিষখালীতে এসে স্থানীয় একটি সংগঠনের সহায়তায় অল্প জায়গায় খুপড়ি ঘর তুলেছে পরিবারটি। তাও আবার যাতায়াতের সঠিক রাস্তা নেই। এখনো কোনো সরকারি সহায়তা তাদের কপালে জোটেনি।

তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপা রানী সরকার জানান, “এই মুহূর্তে কোনো বরাদ্দ নেই। তবে বরাদ্দ আসলেই প্রতিমার পরিবারের জন্য বসতঘর ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।”

দারিদ্র্য প্রতিমার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। ইতোমধ্যে এসএসসি পাস করে ঢাকায় এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছেন তিনি। লক্ষ্য, পড়াশোনার পাশাপাশি জাতীয় দলে স্থায়ী হয়ে দেশের নাম আরও উজ্জ্বল করা।

মা সুমিতা মুন্ডা আবারও বললেন, “আমার নিজের কিছু নেই। তবে মেয়ের অর্জনই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সে দেশের হয়ে খেলুক—ভগবানের কাছে এটাই আমার একমাত্র প্রার্থনা।”

প্রতিমা মুন্ডার সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের গল্প। তার জীবন দেখিয়ে দেয়, সুযোগ পেলে গ্রামের এক দরিদ্র কিশোরীও দেশের পতাকা বিশ্বের আঙিনায় উড়াতে পারে। প্রতিমার গল্প আজ নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন