এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃষি খামারে ইবির একঝাঁক গণমাধ্যমকর্মীরা

কৃষি গবেষণার এক অনন্য ক্ষেত্র এশিয়ার সর্ববৃহৎ দত্তনগর কৃষি ফার্ম। যা দেশের কৃষি উন্নয়নে অপরিসীম ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রায় তিন হাজার একর জমি নিয়ে গঠিত এ খামারের বেশির ভাগ পড়েছে ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায়। কিছুটা পড়েছে পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগরে। ১৯৪০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঠিকাদার হেমেন্দ্রনাথ দত্ত এ খামার গড়ে তোলেন। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম দেন দত্তনগর কৃষি ফার্ম। দত্তনগর কৃষি ফার্মের আওতায় মোট পাঁচটি বড় খামার রয়েছে গোকুলনগর, পাথিলা, করিঞ্চা, মথুরা ও কুশোডাঙ্গা।
গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ছুটির দিনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সদস্যরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এই ফার্মটি ভ্রমণ করার। তারপর পরিকল্পনা অনুযায়ী সকালে ক্যাম্পাসের বাসে ঝিনাইদহ যাওয়া, পরে রুপসা বাসে জনপ্রতি ৩০ টাকা দিয়ে কালিগঞ্জ এবং সর্বশেষ শাপলা এক্সপ্রেসে জনপ্রতি ৭০টাকা ভাড়া দিয়ে হাসাদাহের উদ্দেশ্যে যাত্রা। পরে ইজি বাইক নিয়ে বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ আমরা দত্তনহর কৃষি খামারে উপস্থিত হই। এরপর খামারের বটতলায় প্রকৃতির নির্মল বাতাসে আমরা গানের আড্ডা দিই এবং সাথে ঝালমুড়ি খাই।
এসময় জানতে পারি, খামারটি গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য ছিলো ব্রিটিশ সেনাদের তাজা সবজি সরবরাহ করা। পওে এটি এ অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এখানে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার একর। নিচু জমি আছে ৬০০ একর এবং বিল এলাকা রয়েছে ২০০ একরের ওপরে। আরও জানতে পারি, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর হেমেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর প্রিয় দত্তনগর ছেড়ে স্থায়ীভাবে কলকাতা চলে যান। তখন তাঁর ম্যানেজার ও কর্মচারীদের ওপর ফার্ম দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ফার্মটি অধিগ্রহণ করে পরিচালনার দায়িত্ব দেয় কৃষি বিভাগের ওপর। ১৯৬২ সালে এটি কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং আজকের বিএডিসির তত্ত্বাবধানে চলে যায়। বিএডিসি তখন থেকে ফার্মের যাবতীয় সম্পত্তি শস্য-বীজ উৎপাদনসহ যথাযথ কাজে লাগিয়ে আসছে। প্রতিবছর এ ফার্মে প্রচুর পরিমাণ দেশি-বিদেশি শস্য-বীজ উৎপাদিত এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয় এবং বিদেশেও রপ্তানি হয়। এতে প্রতিবছর রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হয়।
সারাদেশে বছরে যে ফসল উৎপাদন হয়, তার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায় উৎপাদিত হয় বলে জনশ্রুতি আছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দত্তনগর কৃষি খামারে উৎপাদিত। এ ছাড়া গবাদি পশু উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ ও মাংসের চাহিদা পূরণ, বিভিন্ন রকম দেশি-বিদেশি মাছ ও পোনা উৎপাদনে দত্তনগর কৃষি খামার অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। আগেই বলা হয়েছে, দেশের বৃহত্তম কৃষি খামারের সঙ্গে একটি গবাদি পশুর খামার এবং একটি বিশাল বিল রয়েছে।
আমরা এখানে গিয়ে দেখতে পাই, কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিপণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে! এসময় ফার্মের কর্মকর্তারা জানান, এখানে নতুন জাতের বীজ উদ্ভাবন, কীটনাশকের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা এবং অর্গানিক চাষের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ফার্মে আরও রয়েছে উন্নত বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণাগার। এখানে উৎপাদিত মানসম্মত বীজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়, যা কৃষকদের জন্য উন্নত ফলনের সুযোগ তৈরি করে।
পরে দুপুর দেড়টার দিকে আমরা ইজি বাইকে করে রওনা দিই বলুহরপুর মৎস্য খামারের উদ্দেশ্যে। ঝিনাইদহের কোঁটচাদপুরে বলুহরপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে এই মৎস্য খামাওে যাওয়া যায়। এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং আধুনিক মৎস্য খামারগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় ৪০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই খামারে প্রায় ৫০টিরও বেশি পুকুর রয়েছে। এখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া এবং চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়। এখানে মাছের প্রজনন এবং পোনা উৎপাদন কেন্দ্রও রয়েছে। উন্নতমানের পোনা উৎপাদন করে তা সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। খামারের কর্মকর্তারা জানান, মাছ চাষের এই আধুনিক পদ্ধতিগুলো পানির ব্যবহার কমিয়ে দেয় এবং পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করে। একই সাথে, কম জায়গায় অনেক বেশি মাছ উৎপাদন করা যায়।
এই মৎস্য খামারে মাছের রোগ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া, এখানে মাছের স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা হয়, যা মাছের দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। এছাড়া এই মৎস্য খামারে একটি বিশাল বাঁওড় আছে। যেখানে জনপ্রতি ৫০ টাকা দিয়ে নৌকা ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। আমরা দুইটি নৌকা নিয়ে এই বাঁওড় পরিদর্শন করি। যা অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।
পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আমরা ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। এই একদিনের পরিদর্শন শুধু একটি বিনোদনমূলক ভ্রমণ ছিল না বরং এটি ছিল একটি শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। আমরা সরাসরি দেখতে পেয়েছি কীভাবে কৃষি এবং মৎস্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই দুটি স্থান বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
যদি নিজেকে দেশমাতৃকার চিরাচরিত রূপের সঙ্গে পরিচিত করাতে চান অথবা নিবীড় সবুজে একটু সতেজ নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে চান তবে ঝিনাইদহের মহেশপুরে দত্তনগর কৃষি ফার্ম পরিদর্শন করতে পারেন।