সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • এক মাসের ব্যবধানে এলপিজির দাম বৃদ্ধি স্ত্রীদের নামে প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি লাইসেন্স ও লাজফার্মায় বিনিয়োগ নামে-বেনামে সম্পদের অভিযোগ, ডেপুটি কমিশনার সাবরিনা আমিনের বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে দ্রুত তথ্য পাওয়ার আশা শামা ওবায়েদের ভূমিকম্প মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকার ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা সংসদ ভবনে বিদ্যুৎ অপচয় রোধে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত, ডিপিপি তৈরির নির্দেশ বেক্সিমকোর তিন প্রতিষ্ঠানের ঋণ জালিয়াতি, সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে তিন মামলা শ্রমিক অসন্তোষের সুযোগে কারখানা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে দালাল চক্রের মূল হোতা আটক, উপরমহলের নির্দেশে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ!
  • রেক্টোর অনুসন্ধান ছয় বছরেও শেষ হয়নি

    স্ত্রীদের নামে প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি লাইসেন্স ও লাজফার্মায় বিনিয়োগ

    স্ত্রীদের নামে প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি লাইসেন্স ও লাজফার্মায় বিনিয়োগ
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সরকারি চার কর্মকর্তার স্ত্রীদের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘রেক্টো লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের অনুসন্ধান ছয় বছরেও শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সময়ে অন্তত ছয়বার অনুসন্ধান দল গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। একের পর এক অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি।

    অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি চার চাকরিজীবীর অর্থ তাঁদের স্ত্রীদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বৈধ করার চেষ্টা। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব, পরিচালকদের আর্থিক লেনদেন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বেশ কিছু অসংগতির তথ্য উঠে আসে।

    ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি সরকারি চার চাকরিজীবীর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ অধিকতর তদন্তের জন্য দুদকের মানিলন্ডারিং অনুবিভাগে পাঠায় বিএফআইইউ। এর প্রায় দেড় মাস পর, ওই বছরের ১ মার্চ প্রথম অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। দলের নেতৃত্বে ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস বিভাগ থেকে প্রেষণে আসা উপপরিচালক মো. এদিপ বিল্লাহ। সদস্য ছিলেন সহকারী পরিচালক সৈয়দ আতাউল কবীর।

    এদিপ বিল্লাহর বদলির পর অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান দুদকের উপপরিচালক ইকবাল হোসেন। তাঁর দাখিল করা প্রতিবেদন নিয়ে ২০২৩ সালের ২৩ মে কমিশনের সভায় আলোচনা হয়। সভায় অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থের উৎস যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। তাঁদের স্বামীদের সম্পদ সম্পর্কেও অনুসন্ধান না করেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে তিরস্কার করে নতুন দল গঠন করে পুনরায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।

    এরপর উপপরিচালক আবু সাঈদকে প্রধান করে পুনঃঅনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে দলটি একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল উপপরিচালক সৈয়দ তাহসিনুল হককে দলনেতা এবং সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল ইসলামকে সদস্য করে দল পুনর্গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ২২ জুন উপপরিচালক আল আমিনকে দলনেতা করা হয়। সদস্য হিসেবে বহাল থাকেন নাজমুল ইসলাম।

    সর্বশেষ গত ৬ সেপ্টেম্বর উপপরিচালক (মানিলন্ডারিং) নূর-ই আলমের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আবারও অনুসন্ধান দল পরিবর্তন করা হয়। এবার উপপরিচালক (ব্যাংক) মো. নাজমুল হাসানকে দলনেতা এবং সহকারী পরিচালক (মানিলন্ডারিং-১) মো. নাজমুল ইসলামকে সদস্য করা হয়েছে।

    দুদকের আইন ও বিধি অনুযায়ী, অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা দায়ের এবং প্রমাণ না মিললে অভিযোগের পরিসমাপ্তি ঘটানোর কথা। কিন্তু ছয় বছরেও কেন এ অনুসন্ধানের নিষ্পত্তি হয়নি, সে বিষয়ে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

    এদিকে অভিযোগ রয়েছে, অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী দুদকে প্রেষণে যোগ দিয়েছিলেন। এ সময়ের মধ্যে দুদকের দুটি কমিশনের পরিবর্তন হয়েছে। মানিলন্ডারিং অনুবিভাগের মহাপরিচালক পদেও পরিবর্তন এসেছে একাধিকবার। একই অনুবিভাগের পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ অবসরে যান। এরপর থেকে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ মোরশেদ আলম। তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা ২০২৭ সালের ৩০ জুন।

    বিএফআইইউর প্রতিবেদনে যেসব তথ্য

    বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রেক্টো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুস্মিতা সাহানা জামান পেশায় স্কুলশিক্ষক। তাঁর স্বামী পারভেজ রানা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী। পারভেজের মা সেতারা পারভীন।

    প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জিন্নাত রহমান গৃহিণী এবং আরএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী। তাঁর স্বামী রবিউল ইসলাম পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)। রেক্টোর সঙ্গে যৌথ ব্যাংক হিসাবধারী শচীন মৌলিকও একজন এএসপি।

    পরিচালক সেলিনা খাতুনের পেশা আত্মকর্মসংস্থান। তাঁর স্বামী সাইদুর রহমান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী ছিলেন। তিনি ইতিমধ্যে চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। অপর পরিচালক নাজিয়া রহমান পেশায় চিকিৎসক। তাঁর স্বামী সোহানুর রহমান গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী।

    বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেক্টো লিমিটেডের নামে সিটি ব্যাংকের কাকরাইল ভিআইপি রোড শাখার হিসাবে ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত চার দফায় মোট এক কোটি টাকা জমা হয়। পরিচালকদের নিজস্ব হিসাব থেকে স্থানান্তর ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবার ২৫ লাখ টাকা করে জমা দেওয়া হয়েছিল। পরে একই বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারির মধ্যে ওই হিসাব থেকে ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়। উত্তোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন সুস্মিতা সাহানা জামান, রবিউল ইসলাম ও পারভেজ রানা।

    প্রতিবেদনে এই লেনদেনকে অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, পরিচালকেরা প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে অর্থ জমা দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তার প্রায় পুরোটাই তুলে নেন।

    এ ছাড়া লাজ ফার্মা ফ্র্যাঞ্চাইজির নামে দুটি ব্যাংক হিসাবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এক কোটি সাত লাখ ১৫ হাজার ৮৪১ টাকা জমা এবং এক কোটি দুই লাখ ১৫ হাজার ৬৫ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হিসাবের লেনদেনও বিএফআইইউর পর্যালোচনায় এসেছে। ব্যাংক হিসাবগুলো জব্দ করার অনুরোধ জানিয়ে ২০২১ সালের ১ জুন দুদকের মানিলন্ডারিং অনুবিভাগ থেকে বিএফআইইউকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

    প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেক্টো লিমিটেড ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই নিবন্ধন সনদ এবং ১৭ জুলাই ট্রেড লাইসেন্স পায়। তবে এর আগেই ১২ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি লাজ ফার্মা লিমিটেডের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার চুক্তি করে। লাইসেন্স ও নিবন্ধন পাওয়ার আগেই এ ধরনের চুক্তি করাকে বিএফআইইউ অস্বাভাবিক হিসেবে দেখেছে।

    ট্রেড লাইসেন্সে রেক্টো লিমিটেডের ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি, আমদানি-রপ্তানি ও ফার্মেসির কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণে ফার্মেসি ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

    প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের মধ্যে দলিলপত্রে আত্মীয়তার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের স্বামীরা পরস্পরের বন্ধু। রেক্টোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়জন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের লেনদেন তাঁদের পেশা ও আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ। তাঁদের নামে ১৭টি ব্যাংকে মোট ৭৭টি হিসাবের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি ঋণ হিসাব ও ১১টি ক্রেডিট কার্ড হিসাব রয়েছে।

    পরিচালক ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক লেনদেন

    বিএফআইইউর প্রতিবেদনে সুস্মিতা সাহানা জামানের নামে সাতটি ব্যাংকের ১৪টি হিসাবে ২০১১ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মোট দুই কোটি ৯৬ লাখ ৪৬ হাজার ৫০৮ টাকা জমা এবং দুই কোটি ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩৮ টাকা উত্তোলনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে সিটি ব্যাংকের কাকরাইল শাখার দুটি হিসাবে কিছু লেনদেন তাঁর পেশা শিক্ষকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব অর্থের উৎস হিসেবে স্বামীর আয়ের কথা জানানো হয়েছিল।

    সুস্মিতার স্বামী পারভেজ রানার নামে ছয়টি ব্যাংকে ১০টি হিসাবের তথ্য পাওয়া যায়। এসব হিসাবে ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দুই কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার ৯১ টাকা জমা এবং দুই কোটি ৯৩ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৬ টাকা উত্তোলন করা হয়। কোনো কোনো হিসাবে নগদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জমা এবং ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে এসব লেনদেনকে তাঁর পেশা ও অর্থের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

    পারভেজের মা সেতারা পারভীনের নামে তিনটি ব্যাংকে পাঁচটি হিসাবেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এসব হিসাবে দুই কোটি ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার ২৮৫ টাকা জমা এবং দুই কোটি ৪৯ লাখ ৯ হাজার ৬০৯ টাকা উত্তোলন করা হয়। হিসাবগুলোর নমিনি হিসেবে পারভেজ রানা ও তাঁর স্ত্রীকে রাখা হয়েছিল।

    পারভেজ, তাঁর স্ত্রী ও মায়ের ব্যাংক হিসাব একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে বিএফআইইউ ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মোট আট কোটি ৬০ লাখ ৩২ হাজার ৮৮৫ টাকা জমা এবং আট কোটি ১৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫১৩ টাকা উত্তোলনের তথ্য পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারভেজের স্ত্রী ও মা তাঁদের ব্যাংক হিসাবের অর্থের উৎস হিসেবে পারভেজের দেওয়া টাকার কথা জানিয়েছেন। অধিকাংশ হিসাবের নমিনিও ছিলেন পারভেজ রানা।

    বিএফআইইউর এসব পর্যবেক্ষণ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতেই রেক্টো লিমিটেড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান দল পরিবর্তন হলেও অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় তদন্তের অগ্রগতি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত আইনানুগ সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন দুদকের দায়িত্ব।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন