বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে দেখা করতে উত্তম কুমারের সেই অনুরোধ

মহানায়ক উত্তম কুমারকে ঘিরে বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে আছে। তবে পর্দার আড়ালের কিছু ঘটনা তার ব্যক্তিত্বের ভিন্ন দিক তুলে ধরে। এমনই একটি স্মৃতি শেয়ার করেছেন নির্মাতা পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তম কুমারের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজের সুবাদে কাছ থেকে দেখা এই নির্মাতার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে দেখা করতে মহানায়কের করা এক বিশেষ অনুরোধ।
তপন সিনহার ‘জতুগৃহ’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় উত্তম কুমারের সঙ্গে পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক সিনেমায় মহানায়কের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই উত্তম কুমারের কিছু অজানা গল্প জানিয়েছেন জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে।
সহকর্মীদের সঙ্গে ছিলেন একেবারে সহজ-সরল
১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জতুগৃহ’ সিনেমায় উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করেন পলাশ। তার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, শুটিংয়ের ফাঁকে উত্তম কুমার শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে খুব সহজভাবে মিশতেন। কখনো নিজের দামি সিগারেট অন্যদের দিতেন, আবার কখনো সহকর্মীদের সাধারণ বিড়িও টেনে নিতেন।
কয়েক বছর পর তপন সিনহা নির্মাণ করেন ‘হাটে বাজারে’। সিনেমাটিতে অভিনয়ের জন্য অশোক কুমার ও বৈজয়ন্তীমালাকে নির্বাচন করা হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই টালিগঞ্জে এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।
বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন উত্তম
একদিন ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর দুই নম্বর স্টুডিওতে তপন সিনহার অফিসে চিত্রনাট্য শুনতে আসেন বৈজয়ন্তীমালা। তখন অফিসের ভেতরে পরিচালক ও নায়িকা ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের সুযোগ ছিল না। চিত্রনাট্য পাঠ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পলাশসহ অন্য সহকারীদের বাইরে অপেক্ষা করতে বলা হয়।

ঠিক সেই সময় স্টুডিওতে হাজির হন উত্তম কুমার। সবাইকে সিগারেট দেওয়ার পর পলাশকে আলাদা করে ডেকে নেন তিনি। এরপর কাঁধে হাত রেখে জানান, বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে তার জরুরি কথা আছে।
পলাশের স্মৃতিতে উত্তম কুমারের সেই কথাগুলো আজও স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘বৈজয়ন্তীমালাজি এসেছেন। তপনদার কাছে ‘হাটে বাজারে’-র স্ক্রিপ্ট শুনছেন। কিন্তু মালাজির সঙ্গে আমার দেখা করা খুব দরকার।’
অফিসে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় পলাশের কাছেই সাহায্য চান মহানায়ক। এমনকি তার হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন, ‘তুমি একটু মালাজির সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও। তুমি ছাড়া ওখানে কেউ ঢুকতে পারবে না। পলাশ, প্লিজ, না বোলো না।’
মহানায়কের অনুরোধে দরজা খুলে গেল
উত্তম কুমারের এমন অনুরোধে অবাক হয়ে যান পলাশ। এরপর আর দেরি না করে তপন সিনহার অফিসের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে উত্তমের দেখা করার বিষয়টি জানান।

বৈজয়ন্তীমালা তখন তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দেন। পলাশ বাইরে এসে উত্তম কুমারকে জানান, তিনি যেতে পারেন। মহানায়ক প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পরিচালকের কক্ষে ঢুকে পড়েন।
এরপর দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা পলাশসহ অন্যদের মনে তখন একটাই প্রশ্ন—বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে দেখা করতে উত্তম কুমারকে কেন এভাবে অনুরোধ করতে হলো?
আসল কারণ জানা গেল পরদিন
ঘটনার রহস্য অবশ্য পরদিন জানা যায়। পলাশের বর্ণনা অনুযায়ী, তখন উত্তম কুমার প্রযোজক হিসেবে হিন্দি সিনেমা ‘ছোটি সি মুলাকাত’ নির্মাণ করছিলেন। ওই সিনেমার নায়িকা ছিলেন বৈজয়ন্তীমালা।
নতুন প্রযোজক হিসেবে তৎকালীন বম্বের চলচ্চিত্রজগতের বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেননি উত্তম। সিনেমাটিতে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বৈজয়ন্তীমালার শিডিউল অনুযায়ী শুটিং শুরু করা সম্ভব হচ্ছিল না।
এতে নায়িকা কিছুটা বিরক্ত হয়ে সিনেমাটির জন্য আর নতুন শিডিউল দিচ্ছিলেন না বলে পলাশের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। ফলে প্রযোজক হিসেবে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান উত্তম কুমার।
মহানায়কের অন্য এক রূপ
বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করতেই তপন সিনহার অফিসে তার সেই আকস্মিক উপস্থিতি। পর্দায় যিনি ছিলেন অগণিত দর্শকের মহানায়ক, পর্দার বাইরে প্রযোজক হিসেবে নিজের সিনেমা বাঁচাতে তাকেই দেখা গেল উদ্বিগ্ন ও অনুরোধরত এক মানুষের ভূমিকায়।
৯১ বছর বয়সে পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায় সব ঘটনা হয়তো নিখুঁতভাবে মনে করতে পারেন না। কিন্তু উত্তম কুমারের সেই আকুতিভরা কণ্ঠ—‘পলাশ, প্লিজ, না বোলো না’—আজও তার স্মৃতিতে স্পষ্ট।