বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের ১৭৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ; হাসিনা-রেহানার মামলা করবে দুদক জুলাই হত্যা মামলায় রিয়াজের জামিন আবেদন নাকচ করলেন হাইকোর্ট তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ-অনুদান দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুইমারায় বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানে সেনাবাহিনীর উদ্যোগ মির্জা ফখরুলকে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন ‘ইরানিরা কী করে, সবই আমরা দেখি’: ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যায়বিচার-সমতায় টেকসই শান্তি: আইরিন খান মেসির বিদায় স্মরণীয় করতে আর্জেন্টিনার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ জ্বালানি আমদানিতে বাড়তে পারে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ব্যয়
  • জ্বালানি আমদানিতে বাড়তে পারে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ব্যয়

    জ্বালানি আমদানিতে বাড়তে পারে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ব্যয়
    ছবি: এআই
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় গত বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এতে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি টাকার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

    আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) এক বিশ্লেষণে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। বাড়তি এই ব্যয় দেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

    জেডসিএ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা আরও চাপে পড়তে পারে। এতে আমদানি কভার ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে কমে ৫ দশমিক ২ মাসে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

    সংস্থাটির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত যে অর্থ ব্যয় হতে পারে, তা দিয়ে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এ পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ দেশের বর্তমান প্রায় ৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে আরও প্রায় ২৫ শতাংশ সক্ষমতা যুক্ত করতে পারে।

    চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। জুলাই ও আগস্টে এ সংকট আরও তীব্র হয়। হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে ওই দুই মাসে এলএনজি আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে যায়।

    জেডসিএর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করলেও আগস্টে তা নেমে আসে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টনে। তবে আমদানির পরিমাণ কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেশি থাকায় মোট আমদানি ব্যয় কমার পরিবর্তে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

    দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গত ১১ আগস্ট বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা ওই সময়ের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।

    গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প ও কৃষি খাতেও। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টি গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে বন্ধ রয়েছে অথবা সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পও এ সংকটের বাইরে নেই। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের তথ্যও উঠে এসেছে।

    বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতার মাত্রাও উল্লেখযোগ্য। জেডসিএর হিসাবে, ২০২৩ সালে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪৬ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশের সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানি যুক্ত ছিল। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে এসেছে।

    বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি স্পট এলএনজি কার্গো অনুমোদনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও আটটি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছে। ভারত থেকেও অতিরিক্ত ডিজেল চাওয়া হয়েছে।

    একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি কার্গো কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেই সরবরাহের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশের তিনটি বড় এলএনজি সরবরাহকারী চুক্তির আওতায় সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে।

    বিশ্লেষকদের মতে, এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার টেকসই সমাধান নয়। বৈশ্বিক সংকটের সময় চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি দেশে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার কারণে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

    দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত জলবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাও রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসেছে। ওই বছর নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ১ দশমিক ৪৯ গিগাওয়াট।

    হিসাব অনুযায়ী, ১ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের আমদানি করা জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রতিবছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে। অথচ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর মোট সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩৫৮ মেগাওয়াট।

    ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শুধু আমদানি বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাও শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ