সবুজ ও টেকসই অর্থায়নে ভাটা, এক বছরে বিনিয়োগ কমেছে ৫৩ হাজার কোটি টাকা

দেশে সবুজ ও টেকসই অর্থায়নে বিনিয়োগের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে এ খাতের ঋণ আদায়ের পরিমাণও নেমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে সবুজ অর্থায়নে বিনিয়োগ কমেছে ৩ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর টেকসই অর্থায়নে বিনিয়োগ কমেছে ৪৯ হাজার ৭৬২ কোটি ৩ লাখ টাকা।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন ঋণ বিতরণ কমার পাশাপাশি ঋণ আদায়ও কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ। ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে সবুজ অর্থায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৯৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ প্রান্তিকে এ পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৬৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সবুজ অর্থায়নে বিনিয়োগ কমেছে ৩ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
একই সময়ে টেকসই অর্থায়নের পরিমাণও বড় ব্যবধানে কমেছে। ২০২৫ সালের মার্চ প্রান্তিকে এ খাতে বিনিয়োগ ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮১৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৭ কোটি ২ লাখ টাকায়। ফলে এক বছরের ব্যবধানে টেকসই অর্থায়নে বিনিয়োগ কমেছে ৪৯ হাজার ৭৬২ কোটি ৩ লাখ টাকা।
সবুজ অর্থায়নের ঋণ আদায়েও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে এ খাতে আদায় হয়েছে ৫ হাজার ৩৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে আদায় কমেছে ৫৭৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
টেকসই অর্থায়ন থেকে ঋণ আদায়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে এ খাতে আদায় হয়েছে ৫২ হাজার ৩৭৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৭৭ হাজার ৯৪৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আদায় কমেছে ২৫ হাজার ৫৬৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
তবে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নে ৪১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে পুনঃতফসিল বেড়েছে ৩৫৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
টেকসই অর্থায়নেও পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে এ খাতে ৩ হাজার ৭২৪ কোটি ১২ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে পুনঃতফসিল বেড়েছে ১ হাজার ৬৬০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
টেকসই কৃষিতেও অর্থায়ন কমেছে। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে এ খাতে অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। তিন মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে এ পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। ফলে মাত্র তিন মাসে টেকসই কৃষিতে অর্থায়ন কমেছে ২ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফিন্যান্স নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ১১টি শ্রেণির আওতায় ৬৮ ধরনের টেকসই পণ্যে অর্থায়ন করতে পারে। এর মধ্যে কৃষি, কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই), পরিবেশবান্ধব শিল্প এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে।
টেকসই ও সবুজ অর্থায়ন বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত মূল্যায়ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে প্রতিবছর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই রেটিংও প্রকাশ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ টেকসই খাতে বিতরণের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি মোট মেয়াদি ঋণের অন্তত ৫ শতাংশ পরিবেশবান্ধব বা সবুজ প্রকল্পে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন ও পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনসহ বিভিন্ন প্রকল্প এই অর্থায়নের আওতায় পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস ও মানসম্মত বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকায় অনেক উদ্যোক্তা নতুন করে ঋণ নেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এর প্রভাব পড়ছে নতুন ঋণ বিতরণেও।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; অর্থ সঠিক খাতে যাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রকল্প চিহ্নিত করে অর্থায়ন এবং ঋণ বিতরণের পর সেই অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
তাদের মতে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়তে পারে। তবে কাগজে-কলমে কোনো প্রকল্পকে ‘সবুজ’ দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে প্রকল্প যাচাই, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন এবং ঋণ ব্যবহারের নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।