অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে অর্থনীতি, বেকারত্বে জর্জরিত জনপদ

গাইবান্ধার রংপুর চিনিকল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকা এই মিল আজ পরিণত হয়েছে অবহেলা, অদক্ষতা এবং নীতিগত ব্যর্থতার প্রতীকে। একদিকে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে হাজারো শ্রমিক, কর্মচারী ও আখচাষি পরিবার অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—যা কোনোভাবেই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
চিনিকলটি ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলত এ অঞ্চলে আখচাষের প্রসার এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে। দীর্ঘ সময় ধরে এটি সেই লক্ষ্য পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু লোকসানের অজুহাতে ২০২০ সালে মিলটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। বরং বন্ধের পর থেকে কারখানার যন্ত্রপাতি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিশাল জমি ক্রমাগত নষ্ট হচ্ছে—যা ভবিষ্যতে পুনরায় চালু করাকেও কঠিন করে তুলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বন্ধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে। আগে যেখানে সাতটি উপজেলার কৃষক আখচাষে নির্ভরশীল ছিলেন, সেখানে এখন সেই সম্ভাবনা প্রায় বিলীন। আখচাষিরা বাধ্য হচ্ছেন বিকল্প ফসলের দিকে যেতে, যা সবসময় লাভজনক নয়। একই সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ বেকার হয়ে পড়েছে, তাদের জীবিকা আজ চরম অনিশ্চয়তায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি জটিল সমস্যা—জমি দখল। মিলের বিশাল এলাকা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সেখানে দখলদারিত্ব, অনিয়ন্ত্রিত লিজ এবং সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। এতে শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা বা বিলম্বিত পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কি তার সম্পদ রক্ষা এবং জনগণের জীবিকা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছে? একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার বিকল্প পরিকল্পনা, পুনর্বাসন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা জরুরি। রংপুর চিনিকলের ক্ষেত্রে সেই পরিকল্পনার অভাবই আজকের এই সংকট তৈরি করেছে।
এখন সময় এসেছে বাস্তবসম্মত ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। মিলটি আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু করা সম্ভব কি না, তা জরুরি ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে বিকল্প শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নিতে হবে। পাশাপাশি দখলকৃত জমি উদ্ধার এবং সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
রংপুর চিনিকলের ভবিষ্যৎ শুধু একটি কারখানার প্রশ্ন নয়; এটি হাজারো মানুষের জীবন, একটি অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার প্রশ্ন। প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে কার্যকর পদক্ষেপই এখন একমাত্র সমাধান।