জাতীয় নির্বাচনে নারী নেতৃত্বের অপ্রতুলতা: কারণ ও সমাধান

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ আশানুরূপ নয়। মোট ২,৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০৯ জন নারী, যা মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশের সামান্য বেশি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী হলেও নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ এই মাত্রা সমাজে বিদ্যমান কাঠামোগত বৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নারী অধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর এত কম উপস্থিতি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে দুর্বল করে, এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর কণ্ঠ আরও কমে যায়।
গেলো সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সদস্যরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে, ৫১টি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে ৩০টির কোনো নারী প্রার্থী নেই, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা উল্লেখ করেন, জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫-এর ধারা অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে, যা ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক দল এই ন্যূনতম শর্তও পূরণ করতে পারেনি। অধিকারকর্মীরা দাবি করছেন, সাধারণ আসনে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী বাধ্যতামূলক করতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, ন্যূনতম শর্তও পূরণ না হলে রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়। প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেছেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।
নারীপক্ষের সদস্য সাদাফ সায্ সিদ্দিকী বলেন, অনেক নারী নির্বাচনে আগ্রহী হলেও সুযোগ পাচ্ছেন না। প্রক্রিয়া যদি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতো, আরও নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথে এগিয়ে আসতেন।
এছাড়া, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বক্তারা বলেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারী প্রার্থী মনোনয়নকে প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে না দেখে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখতে হবে।
গত বছরের নভেম্বরে সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় নারীরা হিমশিম খাচ্ছেন। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এখনও রাজনৈতিক দলগুলোতে বিদ্যমান, যা নারীর অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
৭১টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থার প্ল্যাটফর্ম ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’ এই নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৪.২৪ শতাংশ, যা জনসংখ্যার সাথে কোনো সামঞ্জস্য রাখে না। ১০৯ নারী প্রার্থীর মধ্যে ৭২ জন দলীয় মনোনীত, বাকি ৩৭ জন স্বতন্ত্র। নারীরা এখনও পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণে শঙ্কা অনুভব করছেন।