আগামী জাতীয় নির্বাচনে গেম চেঞ্জার তরুণ ও সুইং ভোটাররা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। যদিও নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রচারণা এখনো শুরু হয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা থেমে নেই। সমর্থকরা নানা কৌশলে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় রয়েছেন।
গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন একতরফা ও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এবারের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সেই আগ্রহের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন জরিপে। বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিক সংগঠনের করা সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
‘সুইং ভোটার’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের বড় অংশই হচ্ছেন তথাকথিত ‘সুইং ভোটার’, যাদের ভোটই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সুইং ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি স্থায়ী আনুগত্য রাখেন না; বরং পরিস্থিতি, প্রার্থী, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ বিবেচনা করে ভোট দেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন,
“সুইং ভোটারদের কোনো দলের প্রতি দৃঢ় অবস্থান থাকে না। কিন্তু তারাই প্রায়শই নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।”
তরুণ ভোটার ও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা কেন সুইং ভোটার?
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ, যার মধ্যে চার কোটির বেশি তরুণ ভোটার। এদের বড় একটি অংশ এবারই প্রথম ভোট দেবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন, ফলে তারাও সুইং ভোটার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকায় দলটির ঐতিহ্যগত ভোটারদেরও সুইং ভোটার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা এবার বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারেন।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন,
“আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের ভোটারদের বড় অংশই এবার সুইং ভোটারে পরিণত হয়েছেন।”
সুইং ভোটার কী এবং এই ধারণার উৎপত্তি
‘সুইং ভোটার’ ধারণাটি বাংলাদেশে তুলনামূলক নতুন হলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এটি বহু পুরোনো। একসময় দলভিত্তিক ভোটব্যাংক শক্তিশালী থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ভোটার দল পরিবর্তন করতে শুরু করেন। এই দোদুল্যমান অবস্থান থেকেই ‘সুইং ভোটার’ ধারণার জন্ম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন,
“সুইং ভোটাররা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেয় না। ভোটের দিন তারা চিন্তা করে— কাকে ভোট দিলে লাভ হবে, কাকে দিলে নিরাপদ থাকবে।”
বাংলাদেশের অতীত নির্বাচন ও সুইং ভোটারের ভূমিকা
বাংলাদেশের সর্বশেষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের ব্যবধান আগের নির্বাচনের তুলনায় হঠাৎ বড় হয়ে যায়, যা বিশ্লেষকদের মতে সুইং ভোটারদের ভূমিকার ফল।
১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনগুলোতেও দেখা গেছে, বড় দুই দলের ভোটের হার কাছাকাছি থাকলেও সুইং ভোটারদের সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৪৩ থেকে ৪৯ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি, যা এবারের নির্বাচনে সুইং ভোটারদের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কেন এবারের নির্বাচন ‘গেইম চেঞ্জার’ হতে পারে?
২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনকে অনেকেই টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার আগামী নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৪৩.৫৬ শতাংশ। এই তরুণ ও সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ভোটই নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর ভাষায়,
“এই তরুণ সুইং ভোটাররাই আগামী নির্বাচনের গেইম চেঞ্জার হবে।”
অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিনও মনে করেন,
“আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবছর সুইং ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। যারা এই ভোটারদের কাছে টানতে পারবে, তারাই নির্বাচনে এগিয়ে থাকবে।”