মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

৩০টি রাজনৈতিক দলেই নেই নারী প্রার্থী: নারী অধিকার ফোরামের সতর্কবার্তা

৩০টি রাজনৈতিক দলেই নেই নারী প্রার্থী: নারী অধিকার ফোরামের সতর্কবার্তা
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ঘোষিত ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ তুলেছে নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম। সংগঠনটির মতে, ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকারও অধিকাংশ দল পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা নারী নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অনাগ্রহের স্পষ্ট প্রমাণ।

ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দলে একজন নারী প্রার্থীও নেই। সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রতিনিধি রিতু সাত্তার।

এসময় গণসাক্ষরতা অভিযান, দুর্বার নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশন, নাগরিক কোয়ালিশন, নারী উদ্যোগ কেন্দ্র (নউক), নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা, নারী সংহতি, নারীপক্ষ, নারীর ডাকে রাজনীতি, ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (ফ্যাব), বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্র এবং ভয়েস ফর রিফর্মসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

রিতু সাত্তার বলেন, নারীরা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে মনোনয়ন চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, নারী মনোনয়ন কাগজে-কলমে ঘোষিত সীমার মধ্যেই আটকে আছে। যৌথ নারী প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দলগুলো তা কাজে লাগায়নি। এমনকি জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতিকেও তারা গুরুত্ব দেয়নি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে দক্ষ ও প্রভাবশালী নারী নেতৃত্ব থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রাখা হয় না। নারীদের অনেক ক্ষেত্রে শুধু কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কিন্তু বাস্তব ক্ষমতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের অংশগ্রহণ নেই—এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শেষ পর্যায়ে কিছু স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলেও সার্বিকভাবে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম এবং হতাশাজনক। নির্বাচন কমিশন ‘জেন্ডার ইনক্লুসিভ ইলেকশন’-এর কথা বললেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।

বক্তারা আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। নারী শিক্ষার্থীরা হল থেকে বেরিয়ে এসে আন্দোলনের গতি সঞ্চার করেছিলেন। অথচ সেই নারীরাই আজ নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত হচ্ছেন—এটি দুঃখজনক ও বৈষম্যমূলক।

তাদের মতে, পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক যোগ্য নারী শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। ফলে নারী ও পুরুষের জন্য নির্বাচনি মাঠে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ এখনো নিশ্চিত হয়নি।

নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম স্পষ্টভাবে জানায়, তারা সংরক্ষিত আসনের বিপক্ষে। সংগঠনের নেতারা বলেন, নারীরা আলাদা কোনো সুবিধা চান না; তারা নিজেদের যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে চান।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ৫৪ বছরের মধ্যে এটি এমন একটি নির্বাচন যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। এটি শুধু নারীদের জন্য নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্যই লজ্জাজনক। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের ঘোষিত অঙ্গীকারই রক্ষা না করে, তাহলে ভবিষ্যতে নারীরা কেন তাদের ওপর আস্থা রাখবে—এই প্রশ্ন এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

বক্তারা বলেন, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্র গঠনের সময় পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল, তবুও তখনও এমন অনেক নারী ছিলেন যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে সক্ষম ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার বাস্তব উদাহরণও আমরা দেখেছি। সুতরাং রাজনীতি কোনো একক লিঙ্গের বিষয় নয়; নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণেই একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

ফোরাম নেত্রী সামিনা ইয়াসমিন বলেন, দেশে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি। যদি ভোটারের অর্ধেকের বেশি নারী হন, তাহলে তাদের বাদ দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত—সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। তাই নারীদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, সংগঠিত করা এবং সক্রিয় করে তোলাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে যারা নারী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন, তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছে ফোরাম। তারা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, কীভাবে তা মোকাবিলা করছেন এবং ভবিষ্যতে এসব বাধা দূর করার পথ কী হতে পারে—সেসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নারীর অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কথা বলা হলেও এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম, যা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঘোষিত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যে ব্যর্থ হয়, তাহলে আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। যদিও এবারের নির্বাচনে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়, তবু বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন