মেঘনায় অভিযানে ড্রেজার জব্দ, ধরাছোঁয়ার বাইরে বালু মালিকরা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার মেঘনা নদী দীর্ঘদিন ধরেই যেন একটি উন্মুক্ত বালু খনিতে পরিণত হয়েছে।
সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন হলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
অবশেষে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চরলাপাং এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানে ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হলেও অবৈধ বালু মহালের মূল হোতারা আবারও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলেন।
প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী এই অভিযানে ২টি ড্রেজার ও ২টি বাল্কহেড জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে ড্রেজার ও বাল্কহেডের চালক এবং শ্রমিকসহ মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে যাদের বিনিয়োগে, নির্দেশে ও রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে—সেই প্রভাবশালীদের কাউকেই অভিযানের আওতায় আনা হয়নি।
গ্রেপ্তার হওয়া সবাই শ্রমজীবী মানুষ। পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা থেকে আসা এসব শ্রমিকদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সর্বনিম্ন এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রতিদিন যেখানে লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন হয়, সেখানে সিদ্ধান্তদাতা কি এসব শ্রমিক? নাকি তারা কেবল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বলি?
জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, নবীনগরের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মেঘনা নদীতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে ভারী ড্রেজার বসিয়ে দিন-রাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।
এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়ছে চরলাপাংসহ আশপাশের একাধিক গ্রাম। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—এত বড় আকারের অবৈধ কার্যক্রম প্রশাসনের নজরের বাইরে এতদিন কীভাবে চলতে পারল?
গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রিন্স সরকার ও এম কায়সার। সেনাবাহিনী, জেলা পুলিশ ও নৌপুলিশ অভিযানে সহযোগিতা করে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের অভিযান অনেক সময়ই “খবরের প্রতিক্রিয়ায়” সীমাবদ্ধ থাকে। নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা থাকলে অবৈধ ড্রেজার বসানোর আগেই তা বন্ধ করা সম্ভব হতো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেন,“অভিযান অবশ্যই দরকার। কিন্তু বছরের পর বছর একই চিত্র—ড্রেজার জব্দ হয়, শ্রমিক গ্রেপ্তার হয়, মালিকরা থেকে যায় অদৃশ্য। এতে সিন্ডিকেট ভাঙে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অবৈধ বালু ব্যবসার মালিকদের তালিকা প্রশাসনের অজানা নয়। তবুও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
নির্বাচনের অজুহাত, নাকি সময়ক্ষেপণ?
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, “এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে। বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততা রয়েছে। নির্বাচন শেষে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—নদী কি নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? ততদিনে মেঘনার কতটা অংশ বিলীন হবে, আর কত গ্রাম হারাবে তাদের অস্তিত্ব?
প্রশ্ন থেকেই যায়
অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল মালিকরা কারা?
তারা কেন বারবার আইনের বাইরে থেকে যাচ্ছে?
প্রশাসনের ভেতরে কি কোনো নীরব সমঝোতা রয়েছে?
নাকি শ্রমিক শাস্তিই শেষ কথা?
মেঘনা নদীর বুকের এই অবাধ লুটপাট বন্ধ না হলে একদিন শুধু চরলাপাং নয়, পুরো নবীনগরই পড়তে পারে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে।
এখন দেখার বিষয়—এই অভিযান সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা, নাকি আরেকটি ক্ষণস্থায়ী প্রদর্শনী।