শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

গুরু সত্য ও জয় দয়াময়ের সাধক: মহর্ষি মনোমোহন দত্ত—এক মরমী জীবনের আলোকপথ

গুরু সত্য ও জয় দয়াময়ের সাধক: মহর্ষি মনোমোহন দত্ত—এক মরমী জীবনের আলোকপথ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন কিছু সাধক রয়েছেন, যারা স্বল্প জীবনে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মহর্ষি মনোমোহন দত্ত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের সাতমোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মরমী সাধক ছিলেন একাধারে কবি, দার্শনিক, তর্কবাগীশ, আত্মকেন্দ্রিক বাউল ও সমাজসংস্কারক। সাধারণ মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ মহত্ত্বের উদাহরণ হয়ে আছেন তিনি।

প্রারম্ভিক জীবন ও পরিবার

মহর্ষি মনোমোহন দত্তের জন্ম বাংলা ১২৮৪ সালের ১০ই মাঘে। পিতা পদ্মনাথ দত্ত ছিলেন একজন কবিরাজ ও স্বভাবসাধক, এবং মাতা হরমৌহিনী। তাঁদের পূর্বপুরুষরা সোনারগাঁও ভট্টগ্রামের জমিদার ও বাদশাহি যুগের সাঁজওয়াল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে পরিবারের একটি অংশ সাতমোড়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে।

মনোমোহন দত্তের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের রামজীবন চক্রবর্তীর পাঠশালায়। পরবর্তীতে তিনি গ্রামের স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষালাভ করেন। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ছইফুল্লাকান্দি গ্রামে, এবং স্ত্রী ছিলেন সাধ্বী সৌধামনি দত্ত। তাঁদের একমাত্র পুত্র শ্রী সুধীরচন্দ্র দত্ত।

আধ্যাত্মিক জীবন ও সাধনা

মাত্র ৩১ বছর ৯ মাস বয়সে, বাংলা ১৩১৬ সালের ২০শে আশ্বিনে, তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। স্বল্প জীবনে তিনি অর্জন করেছিলেন গভীর ব্রহ্মজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক আলোকপ্রাপ্তি। মনোমোহন দত্ত বিশ্বাস করতেন—মানুষ যে ধর্মই পালন করুক না কেন, সকল ধর্মই একই স্রষ্টার সন্তুষ্টির পথ। ধর্মীয় বিভেদ দূর করার লক্ষ্যে তিনি সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা প্রচার করতেন “জয় দয়াময়” নামজপের মাধ্যমে।

তাঁর মূলমন্ত্র ছিল “গুরু সত্য” ও “জয় দয়াময়”, যা হৃদয়ে ধারণ করেই তিনি ধাপে ধাপে মহামানবে রূপান্তরিত হন। পার্থিব জীবনে তিনি ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ঘুরেও, তেমন কোনো অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। তবে ধর্মধন হিসেবে অর্জিত তাঁর জ্ঞান ও সাধনা পৃথিবীর সব ধনসম্পদকে ছাপিয়ে যায়।

তাঁর গুরু ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল নিবাসী আচার্য আনন্দ স্বামী। গুরুভক্তির নিদর্শন হিসেবে মনোমোহন দত্ত নিজ গ্রামে “আনন্দ আশ্রম” প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর পরও তিনি প্রিয় শিষ্যদের সঙ্গে অলৌকিকভাবে দেখা দিতেন বলে প্রচলিত কাহিনি রয়েছে।

সংগীত ও সাহিত্য

মনোমোহন দত্ত “মলয়া সংগীত”-এর স্রষ্টা হিসেবে অমর। মলয় পর্বত থেকে আগত দক্ষিণা বাতাসের নামেই এই ধারার নামকরণ। তিনি প্রায় ৮৫০টি গান রচনা করেছেন, যার মধ্যে ২৮৭টি ‘মলয়া এক’ ও ‘মলয়া দুই’ গ্রন্থে সংকলিত। এছাড়া প্রায় ১৮টি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে লীলারহস্য, উপবন, তপোবন উল্লেখযোগ্য।

স্মরণ ও উৎসব

আজও প্রতি বছর ১০ই মাঘ, সাতমোড়া গ্রামের আনন্দ আশ্রমে পালিত হয় মনোমোহন স্মরণ উৎসব। সেখানে ভক্ত, সাধক ও গবেষকরা স্মরণ করেন মহর্ষি মনোমোহন দত্তকে—যিনি অল্প জীবনে রেখে গেছেন চিরন্তন মানবতার আলোকধারা।

মহর্ষি মনোমোহন দত্তের জীবন আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর জীবন দর্শন, গান ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও গবেষকরা সমানভাবে প্রভাবিত হন।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন