মেধা যাচাই পরীক্ষা ঘিরে অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের উৎকণ্ঠা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের এক কাতারে দাঁড় করানো কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়—এমনটাই মনে করছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের বড় একটি অংশ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মূলত দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ও সাধারণ মানের শিশুরা পড়াশোনা করে। তাদের অধিকাংশ অভিভাবকের পক্ষে একটি সহায়ক বই কেনাও সম্ভব হয় না। ফলে সরকার নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের ওপর নির্ভর করেই এসব শিশু তাদের শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেয়।
অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই কোচিং, গাইড বই, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা ও অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করে থাকে। এই দুই ভিন্ন বাস্তবতার শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে এনে মেধা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করাকে অনেকেই চরম বৈষম্যমূলক বলে আখ্যায়িত করছেন। অভিযোগ উঠেছে, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মেধা, আত্মবিশ্বাস ও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ধ্বংস করতেই একটি আভিজাত্যবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে কিন্ডারগার্টেন পরিচালকদের রিটের পক্ষে আদালত বন্ধ থাকা অবস্থায় সরকারি প্রাথমিক মেধা যাচাই পরীক্ষা স্থগিতের রায় দেওয়া হয়। তবে এরপরও পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা না আসায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে—যখন আদালতের রায় রয়েছে, তখন কেন কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার বিষয়ে দ্রুত ও পরিষ্কার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে না?
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এমন অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং পুরো প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অতিদ্রুত পরীক্ষার বিষয়ে সঠিক, মানবিক ও ন্যায্য সিদ্ধান্ত নিলে সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হতো।
সমালোচকদের দাবি, এই সংকটের মধ্য দিয়ে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে দুর্বল করার অপচেষ্টা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, এটি এক ধরনের আধুনিক ঔপনিবেশিক মানসিকতা—যেখানে গরিব আরও গরিব থাকবে, অশিক্ষিত আরও অশিক্ষিতই থেকে যাবে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন নয়, বরং একটি শ্রেণির ব্যক্তিগত উন্নয়নই এখানে মুখ্য হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, কিছু সিদ্ধান্ত ও নিষ্ক্রিয়তা নীতিনির্ধারকদেরই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে। শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব—একে কোনোভাবেই ব্যবসার পণ্যে পরিণত করা যাবে না।
কেউ কেউ আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের উচিত কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনে সেগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠান ইংরেজ শাসকদের মতোই শিক্ষা নয়, বরং ব্যবসা করতে এসে পুরো সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, অবিলম্বে মেধা যাচাই পরীক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা, বৈষম্যহীন নীতি এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণই পারে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ—যার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
দৈএনকে/জে, আ