বিজয়নগরে আখের রস থেকে তৈরি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘লালি’ গুড়

কেউ আখ কাটতে ব্যস্ত, কেউ আখ থেকে পাতা ছাড়াতে। অন্যদিকে ঘানির মাধ্যমে আখ থেকে রস বের করা হচ্ছে। সেই রস চুল্লিতে ঢেলে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু তরল গুড়। এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার চিত্র । স্থানীয়ভাবে এই গুড় ‘লালি’ নামে পরিচিত। এর চাহিদাও বেশ।
শীতের শুরু মানেই দেশের গ্রামীণ জনপদে আখ থেকে গুড় তৈরির উৎসব। এ মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার দুলালপুর পূর্বপাড়া ও বিষ্ণুপুর গ্রামে চলছে ঐতিহ্যবাহী গুড় উৎপাদনের ব্যস্ততা। ভোরের কুয়াশা কাটার আগেই চুল্লির পাশে হাজির হন কৃষকরা। সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে আখ কাটা, চিপা, রস সংগ্রহ ও জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির একটানা কাজ।
গ্রামের পুরনো রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই নাকে ভেসে আসে জ্বাল দেওয়া আখের মিষ্টি সুবাস। বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় বড় বড় খোলা চুল্লি। তার ওপর বিশাল লোহার পাতিলে টগবগ করে ফুটতে থাকে আখের রস। শ্রমিকরা পালাক্রমে সেই রস নেড়ে ঘন করেন। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর তৈরি হয় খাঁটি গুড়, লালি ও চিনির মতো দানা।
দুলালপুর পূর্বপাড়ার কৃষক আবদুল মালেক বলেন, “শীতের সময়টাই আমাদের সোনার সময়। বছরের আয়ের বড় অংশ আসে এই গুড় বিক্রি থেকে। এ বছর আখের ফলন ভালো হওয়ায় গুড়ের মানও দারুণ হয়েছে।” তাঁর ভাষায়, প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে কাজ।
স্থানীয় লোকজন জানান, প্রাচীন পদ্ধতি ঘানির মাধ্যমে আখের রস থেকে কয়েক যুগ ধরে তৈরি হচ্ছে লালি। শীতকালে মুড়ি বা বাসাবাড়িতে বানানো পিঠাপুলি এই তরল গুড় বা লালির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পছন্দ করেন অনেকেই। তরল গুড় বা লালি কিনতে এবং নিজ চোখে এর উৎপাদনের প্রক্রিয়া দেখতে বিভিন্ন লোকজন বিজয়নগরে আসেন।
প্রতিদিনই দুলালপুর ও বিষ্ণুপুরে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের পাশাপাশি নাসিরনগর, আশুগঞ্জ, সরাইল, নবীনগর, মাধবপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে অনেকে আসছেন সরাসরি গুড় ও আখের রস কিনতে।
অনেকে গরম চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি গরম আখের রস পান করেন। শীতের সকালের আলাদা আনন্দ যেন এই টাটকা রসে। শিশু-কিশোররাও এই মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে সারা বছর। আখ কাটার ক্ষেত থেকে চুল্লি পর্যন্ত সব জায়গায় দেখা যায় তাদের কৌতূহলী উপস্থিতি।
যদিও মৌসুমটি কৃষকদের কাছে আনন্দের, রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জও। জ্বালানি কাঠের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় লাভের পরিমাণ কমেছে বলেও জানান অনেকে।
বিষ্ণুপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, “গুড় বানানো অনেক কষ্টের কাজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুল্লির আগুন সামলাতে হয়। জ্বালানির খরচও বেশ। তারপরও খাঁটি গুড় মানুষের কাছে পৌঁছে দিই।”
গুড় উৎপাদনকারী মোহাম্মদ আলী জানান, তাঁর পূর্বপুরুষরাও এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রামে ১৫ থেকে ২০ জন কৃষক গুড় উৎপাদনে যুক্ত। একশ পরিবারেরও বেশি মানুষ এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। আমি প্রতিদিন ৮০–১০০ কেজি গুড় ও লালি তৈরি করি। লালির প্রতিকেজি ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়। চাহিদা এত বেশি যে পাইকারি বিক্রি করার সুযোগই হয় না।”
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনই বাইরে থেকে শত শত মানুষ গুড় বানানোর প্রক্রিয়া দেখতে আসেন। অনেকেই শুধু আখের গরম রস খেতেও যান।
স্থানীয়দের দাবি, বিজয়নগরের মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও আখের স্বাভাবিক মিষ্টতার কারণেই এখানকার গুড় মানসম্মত ও সুস্বাদু হয়। বহু বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই পেশায় আগের দিনের গরু-চালিত চরণযন্ত্রের জায়গা নিয়েছে আধুনিক মেশিন। তবে গুড় তৈরির মূল পদ্ধতি রয়ে গেছে একই—পুরোপুরি প্রাকৃতিক, খাঁটি ও ঘন।
কৃষকদের দাবি, সরকারীভাবে প্রযুক্তিগত সহায়তা, কম সুদের ঋণ ও সংরক্ষণ সুবিধা দিলে গুড় শিল্প আরও বড় পরিসরে গড়ে উঠবে, যুক্ত হবে নতুন কর্মসংস্থান।