শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

উপমহাদেশের অন্যতম সর্বৃহৎ চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ

উপমহাদেশের অন্যতম সর্বৃহৎ চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

দেশের বৃহত্তম মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ। প্রায় শত বছরেরও বেশি পুরনো এই স্থাপনাটি শুধুমাত্র একটি উপাসনালয় নয়, এটি যেন স্থাপত্যশিল্পের বিশুদ্ধ ব্যাকরণ ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে এর নির্মাণকালে ব্যবহৃত স্থাপত্যশৈলী এবং দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ এটিকে এক ঐতিহাসিক নিদর্শনে পরিণত করেছে, যা কালের কঠিন সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটির নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৩২৫ থেকে ১৩৩০ বঙ্গাব্দের মধ্যে। শুরুতে আল্লাহর ওলিদের উত্তরাধিকারী হজরত মনিরুদ্দিন মনাই হাজী (রহ.)-এর দৌহিত্র আহমদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ও হজরত মকিম উদ্দিন (রহ.)-এর নিজ বাসস্থানের বাগানবাড়িতে প্রথমে একটি একচালা খড়ের ইবাদতখানা নির্মিত হয়েছিল। পরে তা খড় ও গোলপাতা দিয়ে তৈরি দোচালা মসজিদে রূপ নেয়।

​মসজিদটিকে পাকাপোক্ত করার চূড়ান্ত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন আহমদ আলী পাটোয়ারী (রহ.)। তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছায়, ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১৭ আশ্বিন তারিখে হজরত মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.)-এর পুণ্য হাতে এই পাকা মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বৃহৎ মসজিদটির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি নিজেই ইটভাটা তৈরি করেন এবং ৭৭টি আকর্ষণীয় পিলারের ওপর নির্মাণকাজ শুরু করেন।

পাথরের নিখুঁত সাজে সজ্জিত অসংখ্য তারকাখচিত তিনটি বৃহৎ গম্বুজ দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও, ১২৮ ফুট উঁচু একটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে, যা হাজীগঞ্জের চারপাশের দৃশ্য উপভোগের সুযোগ করে দেয়। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়ালগুলো ঝিনুকের মোজাইক বেষ্টিত পিলার এবং নিখুঁত নকশার কারুকার্যে সজ্জিত, যা এক অসাধারণ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। এর মেহরাবটিও বিভিন্ন প্রকার কারুকার্য দ্বারা তৈরি।

২৮ হাজার ৪০৫ বর্গফুট বিস্তৃত এই মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এটি শুধু চাঁদপুরের নয়, বরং বাংলাদেশের জুমাতুল বিদার সবচেয়ে বড় জামাত আয়োজনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। নারীদের জন্যও এখানে পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে।

​ঐতিহাসিকভাবেও এই মসজিদটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জুমার নামাজের আজান ও ইকামতের উদ্বোধনী দিনে অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ চারজন প্রখ্যাত মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ বহু বরেণ্য আউলিয়া বিভিন্ন সময়ে এখানে নামাজ আদায় করেছেন।

​মসজিদের পূর্ব পাশে ধর্মীয় শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে একটি কামিল মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া, মিনারের উঁচু প্ল্যাটফর্ম থেকে বহু মুসল্লি ও পর্যটক হাজীগঞ্জের বিস্তীর্ণ দৃশ্য অবলোকন করার সুযোগ পান।

মসজিদটির সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদ রয়েছে, যার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO)। মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা বংশধর ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবির পাটোয়ারী বর্তমানে মোতাওয়াল্লির দায়িত্বে রয়েছেন।

ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি চাঁদপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত হাজীগঞ্জ উপজেলায়। এটি হাজীগঞ্জ বাজারের চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কের পাশেই সহজে দৃশ্যমান। দেশের যেকোনো স্থান থেকে সড়ক, নৌ বা রেলপথে চাঁদপুর এসে সহজেই এখানে আসা যায়।

​রেলপথে আসার জন্য, লাকসাম রেলওয়ে জংশন থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস (রাত ৮টা) অথবা সাগরিকা ট্রেন (সকাল ১১:৩০টা) ধরে হাজীগঞ্জ রেলস্টেশনে নামা যেতে পারে। স্টেশন থেকে ইজিবাইক বা সিএনজিযোগে স্বল্প খরচে মসজিদের সামনে পৌঁছানো যায়।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ