শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে রোগী সেবায় বাধা দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে রোগী সেবায় বাধা দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সরকারি হাসপাতালের নাম শুনলেই মাথায় আসে দালাল আর হয়রানির কথা। রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের হয়রানি সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেন অতি পরিচিত ঘটনা। হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করতে না করতেই শুরু হয় দালালদের উৎপাত। নানান কৌশলে মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে রোগীদের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় আশপাশের কোনো নিম্নমানের প্রাইভেট হাসপাতালে। প্রায় ই দেখা যায়  টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়ানোর পর ঘুষ দিয়ে পেছনের লোক আগে সাক্ষাতের সুযোগ পায় আর ঘুষ না দিলে দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষা করতে হয় চিকিৎসকের সাক্ষাতের জন্য।


ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে  দালালদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে।  সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার খারাপ চিত্র তুলে ধরে রোগীদের ভাগিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে। চিকিৎসকরা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলে সেগুলোও তারা বিভিন্ন কৌশলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে করাচ্ছে। আর এসব দালালের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হাসপাতালে কর্মরত সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি, আশপাশের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকসহ প্রভাবশালীরা।দালালরা গ্রামের দরিদ্র, অসহায়, যারা কিনা চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানে না তাদের টার্গেট করে। কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচার করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায় এবং ভর্তি করায়। ফলে সরকারি হাসপাতালের স্বল্প মূল্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় এবং অধিক অর্থ ব্যয় করে সর্বস্বান্ত হয়ে ফেরে ভুক্তভোগীরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে  মাঝে মাঝে কিছু লোক দেখানো দালাল বিরোধী  অভিযান চালালেও আসল দালালরা থাকে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। সরেজমিনে খোঁজ নিতে  গিয়ে এমন ই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসে। একাধিকবার তালিকা প্রকাশ এবং জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বার বার উত্থাপনের পরও নির্মূল হচ্ছে না জেলা  সদর হাসপাতালের দালাল চক্র।

প্রতিদিন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। এর সঙ্গে বেড়েই চলছে অনুমোদনহীন বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের সংখ্যা। এসব ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন নীরব থাকায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। দালালদের নিয়ে কার্যত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় কর্মচারীদের যোগসাজশকেই দায়ী করে আসছিলেন নাগরিক সমাজ। হাসপাতালের দেওয়ালের ফটকে বড় করে বিলবোর্ড দেওয়া থাকলেও দালাল হতে হুশিয়ার কিন্তু ভিতরে গেলে দেখা যায় তার উলটো টা। দালালদের গ্রেফতারের জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া থাকলেও  এতেও কোনো আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরসহ জেলাজুড়ে রয়েছে  প্রায় আড়াই শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে দেড় শতাধিক   ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান জেলা শহরে। এর মধ্যে অনেক গুলোর দুই চারজন করে দালাল  জেলা সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রধান ফটকে প্রবেশের পরই ভুল বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বেসরকারি ক্লিনিকে। সরেজমিনে গিয়ে আরো দেখা যায়, এই দালাল চক্রের মধ্যে কিছু ডাক্তার রাও  সিন্ডিকেট হিসেবে তাদের সাথে জড়িত আছে,ইর্মাজেন্সি থেকে রোগী গুলো ওই দালাল চক্রের সিন্ডিকেট ডাক্তারের চেম্বারে পাঠানো হয়।  রোগীরা তাদের সরকারি চেম্বারে গেলে তাদের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলে দেন প্রাইভেট ক্লিনিকের চেম্বারে যেতে,আবার প্রায় সময় এটাও দেখা যায় তাদের সরকারি স্টাফদের দিয়ে রোগী গুলো প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি এক চিকিৎসক জানান, জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওৎ পেতে থাকেন বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধি বা দালাল। তাদের রয়েছে বিভিন্ন কোড ওয়ার্ড। উন্নত চিকিৎসার নাম করে রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রকাশ্যে এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও ক্লিনিকের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে দালালচক্রের যোগসাজশও রয়েছে।

তিনি আরো জানান, মাঝে মাঝে  দালাল গ্রেফতার হলেও পরবর্তীতে নীরব ভূমিকায় রয়েছে প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সময় সদর হাসপাতালের আধিপত্যকে ঘিরে এক প্রতিষ্ঠানের দালালের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের দালালের মারামারিও হয়ে থাকে। এসব ব্যাপারে শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তিনি ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর  হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা.রতন কুমার ঢালী বলেন, সদর হাসপাতালে কম বেশি দালাল রয়েছে তা অস্বীকার করার কিছু নেই। আমাদের জেলা সদর হাসপাতালে  সকল ধরনের পরীক্ষা নিরিক্ষা আছে এই গুলো নিয়মিত করা হচ্ছে। এছাড়া জেলা সদর হাসপাতালে রোগীরা যেন সঠিক চিকিৎসা সেবা পায় সে জন্য আমি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। তাছাড়া হাসপাতাল দালালমুক্ত করতে আমি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি। আমাদের দালাল নির্মূল কমিটি রয়েছে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।বেশির ভাগ দালাল হাসপাতালের বাহিরের প্রাইভেট  ক্লিনিক গুলোর তাদের অধিকাংশ ই মহিলা বোরকা পড়ে আসে তাদের সনাক্ত করতে কষ্ট হয়ে পরে। মাঝে মাঝে দালাল দের ধরে আমরা পুলিশে সোর্পদ করি।এক  দিনেই আর দালালমুক্ত করতে পারব না। এই ব্যাপারে সবার সচেতনতা প্রয়োজন, পুলিশ বিভাগ থেকেও সহায়তা দরকার। এছাড়া যারা দালাল নিয়োগ করেছেন তাদেরও এ ধরনের অপকর্ম থেকে সরে যাওয়া উচিত। তবে আমি আশা করি সকলের সহযোগিতা পেলে খুব দ্রুতই এ হাসপাতাল দালালমুক্ত হবে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সিভিল সার্জন ডা.মোঃ নোমান মিয়া বলেন, জেলা সদর হাসপাতালে সাধারণ মানুষ যাতে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবাটা পাই আমরা সব সময় ওই দিকেই কাজ করে যাচ্ছি। সদর হাসপাতালে প্রায়  সকল ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা হয় এগুলো মানুষ সরকার নির্ধারিত অল্প মূল্যে করতে পারে, সাধারণ মানুষ যাতে বঞ্চিত না হয় কোনো দালালের খপ্পরে না পরে সেই জন্য আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।হাসপাতালের দ্বায়িত্বে থাকা দালাল নির্মূল কমিটিতে যারা আছেন তাদের সাথে  মিটিং এ বসছি সপ্তাহ দুই থেকে তিন বার দালাল প্রতিরোধে  রাউন্ড দিতে হবে।দালালরা যেনো রোগীদের সাথে প্রতারণা করতে না পারে সে জন্য  আমরা জেলা প্রশাসনের সহায়তায়  দালালদের বিরুদ্ধে শীগ্রই একশনের  ব্যবস্থা নিয়েছি।আমি আশা করি জেলা সদর হাসপাতালে সাধারণ মানুষ দালাল মুক্ত ভাবে কাংখিত সেবাটা পাবে।

নাম গোপন রাখার শর্তে এক দালাল বলেন, জেলা ও সদর হাসপাতাল এলাকায় গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মালিকরা এলাকার স্থানীয় প্রভাবশালী লোক, হাসপাতালে কর্মরত ঝাড়ুদার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ইজিবাইক চালকদের নিয়ে দালাল চক্র তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেওয়ার পর দালালরা রোগীদের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। একজন রোগী নিয়ে আসতে পারলে দালাল ১০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং পরিস্থিতি ভেদে ৩ /৪ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পায়। যতবেশি পরীক্ষা করবে রোগী, তত বেশি কমিশন পাবে দালাল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের দালাল নির্মূল ও প্রতিরোধ করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন সাধারণ মানুষ। এই বিষয়ে সচেতন মহল বলছে, দালাল চক্রের কারণে সদর হাসপাতালে  চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন