ঘোড়াঘাটে স্বপ্নের সেতুর ৩০ বছর অপেক্ষা

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ৭টি গ্রামের মানুষের ৩০ বছরের দাবি- দেউলী ঘাটে একটি সেতু। বর্ষা এলেই সিমেন্টের খুঁটির ওপর ভাঙাচোরা বাঁশ-কাঠের সাঁকো পেরিয়ে জীবন বাজি রেখে চলাচল করতে হয়। দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় পিছু নেয় চলাচ করতে হয়।
উপজেলার ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়নের সীমানা ঘেঁষে মাইলা নদীর ওপর দেউলী ঘাট। দীর্ঘ তিন দশক ধরে এখানে একটি সেতুর জন্য আকুল প্রার্থনা করছেন ৭ প্রামের মানুষ। বর্ষা মৌসুমে শিশু, কিশোর,শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও রোগীদের যাতায়াত যেন চরম দুর্ভোগ ও উৎকণ্ঠার আরেক নাম হয়ে দাঁড়ায়। নৌকা কিংবা ভাঙা বাঁশ-কাঠের সাঁকোই এখনো তাদের একমাত্র ভরসা- যা প্রতিদিনই হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। এর শেষ কোথায়?
জানা গেছে, দেউলী ঘাট এলাকাটি কৃষিনির্ভর একটি জনবহুল অঞ্চল ও উপজেলা সদর ওসমানপুরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। এখানে প্রতিদিন নদীর ওপারের ৭টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য নদী পার হন। বর্ষা মৌসুমে কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার জন্য বিরাহিমপুর গুচ্ছগ্রাম হয়ে প্রায় ৫ কিমি রাস্তা অতিক্রম করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হয়। অপরদিকে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। সেতু না থাকায় ভাঙা সাঁকোই তাদের একমাত্র ভরসা।
খাইরুল গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব তারাপদ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, 'যৌবনকালেই সেতু পাইনি। এ বুড়া বয়সে আসে হামরা (আমরা) সেতুর আশা ছাড়া দিছি। সাংবাদিক হেরক কয়া আর কি হবি, তারা কি করবার পাবি! কত এমপি, মন্ত্রী, চেয়ারম্যান, মেম্বর গেল আলো হামাহরের অবস্থা উস্কাই (একই রকম) থাকল।' নদীর এপারের শ্যামপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব শচীনসহ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন ইউএনও রফিকুল ইসলাম শাহারুল।
বিষ্ণু নামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, 'এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে লোকজন এসে এখানে এক সপ্তাহ ধরে তাঁবু ফেলে বিভিন্ন মাপজোক করে মাটি পরীক্ষা করেন। এক সপ্তাহ থেকে তারা চলে গেছেন আর কখনো আসেননি। এ সেতু আসলে হবি কিনা জানি না, এখন হামরা (আমরা) আশাই ছাড়ে দিছি। বন্যার সময় হামাহরে (আমাদের) এমনি কষ্ট, সাঁকো ডুবা যায়া কাঠ ভাসা দূরে চলে যায়। তখন সাঁতরে নদী পার হওয়া লাগে।'
স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে সেতুর দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্ষা এলেই নদী পারাপারে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।
এলাকার শিক্ষার্থী নাসরিন আক্তার বলেন, 'বর্ষায় সাঁকো দিয়ে স্কুলে যেতে খুব ভয় লাগে। অনেক সময় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হই।' এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন সময় জন প্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। তাদের দাবি, দ্রুত এ ঘাটে একটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ২দিন তার কার্যালয়ে গিয়ে তার দেখা পাওয়া যায়নি।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি অফিসিয়াল কাজে রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। তবে প্রকৌশলী অফিস থেকে তথ্য যাচাই করে জানা যায়, সেতুটির ব্যাপারে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার অধিদপ্তরের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে কিন্তু কোনো সংবাদ বা নির্দেশনা আসেনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সার্ভেয়ার জহুরুল ইসলাম।
এ বিষয়ে ৩ নং সিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাত হোসেন জানান, বিগত সরকারের আমলে এমপি থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদ থেকে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এ পর্যায়ে নতুন করে উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের মাধ্যমে আবারও প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে, আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি একটি সুসংবাদ পাব জানতে চাইলে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, 'আমি দেউলী ঘাটে গিয়েছিলাম।
আসলে এখানকার মানুষের জন্য সেতুটি খুবই দরকার। সেতু না থাকায় কয়েকটি গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। বন্যার সময় যাতায়াতের সমস্যা, বাচ্চাদের স্কুলে পারাপারে সমস্যা, কৃষিপণ্য পারাপারে সমস্যা, বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাতায়াতসহ জরুরি প্রয়োজনে খুব তাড়াতাড়ি নিশ্চিন্ত মনে পারাপারের কোনো উপায় নেই। সব সময় দুর্ঘটনার একটি আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও উপজেলায় আসতে হলে বহুদূর ঘুরে আসাসহ নানা সমস্যার কারণে সেতুটি খুব জরুরি।
প্রয়োজনে আমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।