চুল পড়া ও ভাঙন কমাতে মেনে চলুন ৮টি সহজ নিয়ম

ঘন, লম্বা ও ঝলমলে চুলের আকাঙ্ক্ষা অনেকেরই। কিন্তু চুল পড়া, আগা ফেটে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিক বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় না। চুলের সুস্থতা ধরে রাখতে শুধু দামি প্রসাধনী ব্যবহার করলেই চলে না; প্রয়োজন সুষম খাবার, নিয়মিত পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে চুলের ভাঙন কমানো এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়। জেনে নেওয়া যাক চুলের যত্নে কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি।
১. খাবারে রাখুন প্রয়োজনীয় পুষ্টি
চুলের গোড়া সুস্থ রাখতে শরীরের পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রয়োজন। তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান রাখুন। ডিম, মাছ, মাংস ও ডাল প্রোটিনের ভালো উৎস। পাশাপাশি পালংশাক, বাদাম ও বিভিন্ন মৌসুমি ফল খাওয়ার অভ্যাস করুন।
প্রোটিনের পাশাপাশি আয়রন, জিঙ্ক, বায়োটিন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও চুলের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত পানিও পান করতে হবে।
২. মাথার ত্বকে আলতোভাবে ম্যাসাজ করুন
প্রতিদিন পাঁচ থেকে ১০ মিনিট আঙুলের ডগা দিয়ে মাথার ত্বকে আলতোভাবে ম্যাসাজ করতে পারেন। চাইলে নারকেল তেল ব্যবহার করা যায়। রোজমেরি বা ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহারের আগে ত্বকে অস্বস্তি বা অ্যালার্জি হচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখুন।
মাথার ত্বকে ম্যাসাজ পরিচর্যার অংশ হতে পারে। তবে এতে চুল দ্রুত গজাবে বা চুল পড়া বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
৩. অতিরিক্ত তাপ থেকে চুলকে বাঁচান
স্ট্রেইটনার, কার্লার ও হেয়ার ড্রায়ারের অতিরিক্ত তাপ চুলের বাইরের স্তরের ক্ষতি করতে পারে। এতে চুল রুক্ষ হয়ে যায় এবং ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তাই এসব যন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে আনুন। প্রয়োজন হলে হিট প্রোটেকশন পণ্য ব্যবহার করুন এবং কম তাপমাত্রা বেছে নিন।
চুল ধোয়ার সময় খুব গরম পানির পরিবর্তে স্বাভাবিক বা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। চুলে রং করলে নিয়মিত কন্ডিশনার ব্যবহার করা ভালো। শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার বাছাইয়ের সময় চুলের ধরন এবং মাথার ত্বকের প্রয়োজন বিবেচনা করুন।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাবেন না
আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন ডি, বায়োটিন ও ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সবার জন্য এসব উপাদানের সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হয় না।
পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে শরীরে কোনো কোনো পুষ্টি উপাদানের মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারে, যা ক্ষতিকর। তাই চুল পড়ার সমস্যা বেশি হলে আগে এর কারণ নির্ণয় করা জরুরি। সুষম খাবারকে অগ্রাধিকার দিন এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৫. প্রয়োজনমতো চুলের আগা ছাঁটুন
চুলের আগা ফেটে গেলে তা ছেঁটে ফেলা ভালো। এতে চুল দেখতে পরিপাটি লাগে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দূর হয়। তবে চুল ছাঁটলে গোড়া থেকে বৃদ্ধির গতি বেড়ে যায় না।
কত দিন পরপর চুল ছাঁটতে হবে, তা নির্ভর করে চুলের ধরন ও আগার অবস্থার ওপর। কারও জন্য দেড় থেকে দুই মাস পরপর ছাঁটা সুবিধাজনক হতে পারে, তবে সবার ক্ষেত্রে একই সময়সূচি অনুসরণের প্রয়োজন নেই।
৬. মানসিক চাপ কমান, পর্যাপ্ত ঘুমান
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কিছু ক্ষেত্রে চুল পড়ার কারণ হতে পারে। তাই কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, ধীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন কিংবা ধ্যানের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমের দিকেও নজর দিন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম সামগ্রিক সুস্থতার পাশাপাশি চুলের যত্নের নিয়মিত অভ্যাস বজায় রাখতেও সহায়ক।
৭. চুল পড়লে কারণ বুঝে চিকিৎসা নিন
চুল পড়ার ধরন ও কারণ অনুযায়ী চিকিৎসাপদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। নির্দিষ্ট ধরনের চুল পড়ার চিকিৎসায় মিনোক্সিডিল ব্যবহার করা হয়। তবে এটি সবার জন্য উপযোগী নয়। ব্যবহার শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ক্যাফেইনযুক্ত সিরাম বা কেরাটিন ট্রিটমেন্টের মতো প্রসাধনী পদ্ধতি ব্যবহারের আগে সেগুলোর সম্ভাব্য উপকার ও সীমাবদ্ধতা জেনে নিন। কোনো পণ্যই দ্রুত বা নিশ্চিতভাবে নতুন চুল গজানোর নিশ্চয়তা দেয় না।
হঠাৎ চুল পড়া বেড়ে গেলে, মাথায় ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৮. ঘুমানোর সময়ও চুলের যত্ন নিন
ঘুমের সময় বালিশের সঙ্গে ঘর্ষণে চুল জট পাকাতে পারে বা ভেঙে যেতে পারে। এ সমস্যা কমাতে সিল্ক বা সাটিনের বালিশের কভার ব্যবহার করতে পারেন।
ঘুমানোর আগে ভেজা চুল ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া ভালো। চুল খুব শক্ত করে বেঁধে ঘুমাবেন না। এতে গোড়ায় টান পড়ে চুলের ক্ষতি হতে পারে। বরং আলগা বেণি করে বা আরামদায়কভাবে চুল গুছিয়ে ঘুমালে জট কম হতে পারে।
চুলের যত্নে প্রয়োজন ধৈর্য
চুলের বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। তাই কয়েক দিনের মধ্যে চুল লম্বা বা ঘন হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, চুলের ক্ষতি কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে উপকার দিতে পারে।
মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত চুল পড়ার পেছনে শুধু পুষ্টির ঘাটতিই দায়ী নয়। হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত কারণ কিংবা অন্য শারীরিক সমস্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন চুল পড়ার সমস্যা থাকলে শুধু প্রসাধনী বা ঘরোয়া পরিচর্যার ওপর নির্ভর না করে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।