একই মোজা না ধুয়ে বারবার পরছেন? বাড়তে পারে ছত্রাকের সংক্রমণ

শীতের দিনে কিংবা অলস ছুটিতে আরামদায়ক পোশাকের সঙ্গে নরম এক জোড়া মোজা পরে ঘরে সময় কাটাতে ভালোবাসেন অনেকে। কিন্তু একবার ব্যবহারের পর মোজা না ধুয়ে পরদিন আবার পরার অভ্যাসও রয়েছে কারও কারও। মোজায় দৃশ্যমান ময়লা বা দুর্গন্ধ না থাকলেও এই অভ্যাস পায়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য ও জীবনধারাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত মোজায় ঘাম, মৃত ত্বককোষ, তেল এবং বিভিন্ন ধরনের জীবাণু জমে থাকে। নিয়মিত না ধুয়ে একই মোজা পরলে পায়ের ত্বক ও নখে ছত্রাকের সংক্রমণসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
জীবনধারা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন স্বাস্থ্য গবেষক লিসা মিলব্র্যান্ড জানিয়েছেন, ব্যবহৃত মোজা না ধুয়ে বারবার পরলে পা ও নখে ক্ষতিকর চর্মরোগ বা সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
কাপড়ের যত্নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কিম রোমিনের মতে, স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এবং মোজার স্থায়িত্ব—দুই দিক বিবেচনায় প্রতিবার ব্যবহারের পর মোজা ধুয়ে নেওয়া ভালো। এতে কাপড়ের তন্তুতে জমে থাকা ময়লা ও ব্যাকটেরিয়া দূর হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে দুর্গন্ধ তৈরির আশঙ্কাও কমে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) প্রতিদিন অন্তত একবার মোজা পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছে। প্রয়োজন হলে দিনে একাধিকবারও মোজা বদলানো উচিত।
একই মোজা বারবার পরা কেন ঝুঁকিপূর্ণ
মানবদেহের যেসব অংশে বেশি ঘাম হয়, পায়ের তলা তার অন্যতম। হাতের তালুর পর পায়ের তলায় ঘামগ্রন্থির ঘনত্ব বেশি। ফলে দীর্ঘ সময় মোজা পরে থাকলে তাতে ঘাম জমে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মৃত ত্বককোষ ও ত্বকের প্রাকৃতিক তেল।
জুতা ও মোজার ভেতরের উষ্ণ, আর্দ্র এবং বদ্ধ পরিবেশ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বংশবিস্তারের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে। একই মোজা না ধুয়ে বারবার পরলে এসব জীবাণু পায়ের ত্বকের সংস্পর্শে থাকার সুযোগ পায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাজমা অ্যান্ড অ্যালার্জি ফাউন্ডেশন অব আমেরিকার প্রধান মিশন কর্মকর্তা মেলানি কারভার সতর্ক করে বলেছেন, ব্যবহৃত মোজায় জমে থাকা ঘাম, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দীর্ঘ সময় পায়ের ত্বকের সঙ্গে লেগে থাকে। এর ফলে ঘর্ষণ ও আর্দ্রতার কারণে কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস, চুলকানি, খসখসে ফুসকুড়ি, ঘা, একজিমা এবং নখে ছত্রাকের সংক্রমণের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যাদের পায়ে অতিরিক্ত ঘাম হয়, তাঁদের জন্য মেরিনো উল বা আর্দ্রতা শোষণ করতে পারে এমন বিশেষ উপাদানে তৈরি মোজা উপকারী হতে পারে।
শুধু ঘাম নয়, ঘরের মেঝে ও জুতার ভেতরের ধুলাবালুও মোজায় আটকে যায়। মেলানি কারভারের মতে, বাইরে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের মোজায় পরাগরেণু, ধূলিকণা ও পোষা প্রাণীর শরীর থেকে ঝরে পড়া খুশকির মতো অ্যালার্জেন জমতে পারে। এসব উপাদান অ্যালার্জির সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
কখন দ্রুত মোজা বদলানো জরুরি
সব পরিস্থিতিতে মোজা একই সময়ের জন্য ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে নিচের পরিস্থিতিগুলোতে ব্যবহৃত মোজা দ্রুত বদলে ধুয়ে নেওয়া উচিত—
মোজা পরা অবস্থায় অতিরিক্ত ঘাম হলে বা শারীরিক পরিশ্রম করলে।
আবহাওয়া অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র থাকলে।
একটানা কয়েক ঘণ্টা মোজা পরে থাকলে।
বাইরে বা নোংরা মেঝেতে মোজা পরে হাঁটলে।
বাতাস চলাচল কম হয় এমন ভারী বুট বা জুতা ব্যবহার করলে।
পায়ে দ্রুত দুর্গন্ধ হওয়ার প্রবণতা থাকলে।
মোজা ও পা দুর্গন্ধমুক্ত রাখার উপায়
ব্যবহৃত মোজা দীর্ঘ সময় না ধুয়ে রেখে দিলে ঘাম ও তেল কাপড়ের তন্তুর গভীরে জমে যেতে পারে। এতে দুর্গন্ধ তৈরি হয়, যা সাধারণ ডিটারজেন্টে দূর করাও কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু মোজা নয়, নিয়মিত পরিষ্কার না রাখলে জুতাতেও স্থায়ী দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে।
বস্ত্রবিশেষজ্ঞ কিম রোমিন মোজা পরিষ্কারের ক্ষেত্রে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন—
১. মোজা উল্টো করে ধুতে হবে: ওয়াশিং মেশিনে বা বালতিতে দেওয়ার আগে মোজা উল্টো করে নেওয়া ভালো। এতে মোজার ভেতরের অংশে জমে থাকা ঘাম, তেল ও মৃত ত্বককোষ সরাসরি ডিটারজেন্টের সংস্পর্শে আসে।
২. ওয়াশিং মেশিনে অতিরিক্ত কাপড় দেবেন না: একসঙ্গে অতিরিক্ত কাপড় দিলে পানি ও ডিটারজেন্ট ঠিকভাবে চলাচল করতে পারে না। তাই মোজা পরিষ্কারের জন্য মেশিনে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা জরুরি।
৩. ভালো মানের ডিটারজেন্ট ব্যবহার করুন: ঘাম ও শরীরের তেল থেকে তৈরি দাগ এবং দুর্গন্ধ দূর করতে উপযোগী ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা উচিত।
৪. পা ও জুতার যত্ন নিন: প্রতিদিন সাবান দিয়ে পা পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি জুতা মাঝেমধ্যে বাতাসে বা রোদে রেখে ভেতরের আর্দ্রতা কমানো যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, মোজা পরিষ্কার রাখার অভ্যাস শুধু দুর্গন্ধ এড়ানোর জন্য নয়, পায়ের ত্বক ও নখের সুস্থতা বজায় রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই মোজা দেখতে পরিষ্কার মনে হলেও ব্যবহারের পর ধুয়ে নেওয়াই স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাস।