মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বিপর্যয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের কিছুটা প্রভাব ছিল বলে স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর দাবি, ইরান ইস্যুতে নেওয়া পদক্ষেপের গুরুত্ব ভোটাররা বুঝতে পেরেছেন এবং তাঁকে সমর্থনও করেছেন।
মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় এর পেছনে ইরানের বিষয়টি কিছুটা দায়ী, তবে একই সঙ্গে মানুষ এটাও বুঝেছে যে ইরানের ক্ষেত্রে আমি যা করেছি, তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টি এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হয়েছে। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও বড় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
মার্কিন রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ফল ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রশাসনের ক্ষমতা ও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
তবে এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজ করবেন, সে বিষয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা তাঁর কাছে এমন কিছু আইন প্রস্তাব পাঠাবে, যেগুলো তাঁর কাছে ‘পাগলামি’ মনে হবে। সেগুলোতে তিনি ভেটো দেবেন।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তারা এমন সব প্রস্তাব পাঠাবে যা পুরোপুরি পাগলামি, আর আমি সেগুলোতে ভেটো দেব। কয়েক মাস ধরে এভাবে ভেটো দেওয়ার পর, তারা ফোন করে জানতে চাইবে, কীভাবে কাজগুলো সম্পন্ন করা যায়? তখন আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ব্যাপ্তি ও গভীরতা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে সাউথ ক্যারোলিনা, টেক্সাস ও আইওয়ার মতো রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যেও দলটির সাফল্য নজর কেড়েছে। এসব জায়গায় আগে ডেমোক্র্যাটদের জয় কঠিন বলে মনে করা হতো।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য এবং ট্রাম্পের নীতির প্রতি ভোটারদের ক্ষোভের বিষয়টি উঠে এসেছে।
কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও খ্রিষ্টান ধর্মযাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টনের সিনেট নির্বাচনে জয়কে বিশেষ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় এক শতাব্দী আগে মহামন্দার পর থেকে অঙ্গরাজ্যটিতে এমন ঘটনা ঘটেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওহাইয়োতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউন এমন একটি আসনে জয় পেয়েছেন, যা দুই বছর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের দখলে ছিল। অন্যদিকে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন। প্যাক্সটনকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ওহাইয়ো ও টেক্সাস—দুই অঙ্গরাজ্যেই দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
সাউথ ক্যারোলিনায়ও বড় চমক দেখিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুস। তিনি রিপাবলিকান সিনেটর ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই অঙ্গরাজ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
নির্বাচনের আগে প্যাক্সটন ও গ্রাহামের মতো বিতর্কিত প্রার্থীদের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন নিয়েও আলোচনা ছিল। প্যাক্সটন ২০২৩ সালে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগসহ বিভিন্ন বিতর্কও ছিল। অন্যদিকে গ্রাহাম নিজের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কথা স্বীকার করেছিলেন, যা নির্বাচনী প্রচারণায় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে প্যাক্সটন, গ্রাহাম ও ওহাইয়োর জন হাস্টেডের পক্ষে জোর প্রচার চালান ট্রাম্প। দুই ডজনের বেশি জনসভায় অংশ নিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বারবার বলেছিলেন, ‘মনে করবেন, ব্যালট পেপারে আমার নামও রয়েছে।’
তবে নির্বাচনের ফল রিপাবলিকানদের বিপক্ষে যেতে শুরু করলে মঙ্গলবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ভিন্ন সুরে পোস্ট দেন ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘আমি তো ব্যালট পেপারে ছিলাম না! যদি থাকতাম, তবে আমরা বিশাল ব্যবধানে জয়ী হতাম! বিষয়টি খেয়াল করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।’