সিগন্যাল আধুনিকায়নে ৪২ কোটি টাকার কাজ নিয়ে বিতর্ক, দরপত্রের শর্ত বদলানোর অভিযোগ

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরও ৫০টি পয়েন্টে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও হয়।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, কাজ ভাগ করে দেওয়া এবং বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ৩৮টি ট্রাফিক সিগন্যালের মধ্যে প্রায় ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের ২৮টি পয়েন্টের কাজ পেয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মীদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। অন্যদিকে, বাকি ১০টি পয়েন্টের কাজের চুক্তি নৌবাহিনীর মালিকানাধীন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের নামে হলেও বাস্তবায়নে বিআইটি টেকনোলজি ও কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক কর্মকর্তার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা
২০১৩ সালে তৎকালীন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রদল নেতাসহ মোট সাতজন গুম হন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গঠিত গুম কমিশনের কাছে এ ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা কিসমৎ হায়াৎ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক।
গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক এই কর্মকর্তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন
ডিএনসিসি সূত্র ও ই-জিপির তথ্য অনুযায়ী, উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০টি ইন্টারসেকশনের ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নে প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছরের ৪ ডিসেম্বর। প্রথম দফায় চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও উপযুক্ত ঠিকাদার পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে দরপত্র বাতিল করা হয়।
দ্বিতীয় দফায় দরপত্র জমার শেষ সময় ছিল গত ৩ মে দুপুর ১টা। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ঠিকাদারের কাজের ন্যূনতম অভিজ্ঞতার আর্থিক মানদণ্ড বা এসএলটি ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা করে। একই সঙ্গে দরপত্র জমা দেওয়ার সময় এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নির্দিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্যতার আওতায় আনতেই এ পরিবর্তন করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয় দফায় কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং, বিআইটি টেকনোলজি ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স যৌথভাবে দরপত্র জমা দেয়। অন্যদিকে এককভাবে অংশ নেয় ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড।
অভিযোগ অনুযায়ী, অভিজ্ঞতার বিচারে এগিয়ে থাকলেও মালামালের তালিকায় একটি ‘রোড কাটার মেশিন’ উল্লেখ না থাকায় ডকইয়ার্ডের দরপত্র বাতিল করে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। অথচ সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, দরপত্রের অপ্রধান বিচ্যুতি নির্দিষ্ট শর্তে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। এ ক্ষেত্রে যন্ত্রটির অনুপস্থিতিকে গুরুতর বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তৃতীয় দফার দরপত্রে ডকইয়ার্ডের নামে চুক্তি
পরবর্তী সময়ে তৃতীয় দফায় আবিদ মনসুর কনস্ট্রাকশন, কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স যৌথভাবে দরপত্র জমা দেয়। ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসও আলাদাভাবে অংশ নেয়। এবার বিআইটি টেকনোলজি সরাসরি দরপত্রে অংশ না নিলেও নেপথ্যে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিএনসিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের সঙ্গে কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিআইটি টেকনোলজির সুবিধাভোগীদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রশাসক।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ডকইয়ার্ডের নামে চুক্তি হলেও সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে বিআইটি টেকনোলজিকে যুক্ত করা হয়। গত ৫ জুলাই দরপত্র খোলার পর ১৯ আগস্ট কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ৮ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বিআইটি টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হাসান (সুমন) নথিপত্রে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকলেও বাস্তবে কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে মেয়র আতিকুল ইসলামের সময়ে দরপত্র ছাড়াই বিআইটি টেকনোলজি থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় এআইভিত্তিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেনা এবং মশক কর্মীদের জন্য ফোরজি বডি ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছিল।
২৮টি সিগন্যালের কাজ পাঁচ প্যাকেজে
অন্য ২৮টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনের কাজ বড় দরপত্রের পরিবর্তে পাঁচটি ছোট প্যাকেজে ভাগ করে ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল। গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত এ দরপত্র প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্যাকেজভিত্তিক কাজের মধ্যে কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ পারভেজের মালিকানাধীন বলে উল্লেখ করা ‘মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় ছয়টি পয়েন্টের কাজ পায়। যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ পায় চারটি পয়েন্টের কাজ, যার মূল্য ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
এ ছাড়া মাইশা কনস্ট্রাকশন ও ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার যৌথভাবে ৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় পাঁচটি পয়েন্টের কাজ পায়। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও এম এস ইফাদ এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকায় পাঁচটি পয়েন্টের কাজ পায়। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজানের ছোট ভাই এইচ এম হেলালের প্রতিষ্ঠান ‘এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং’ আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গে যৌথভাবে ১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় আটটি ইন্টারসেকশনের কাজ পায়।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে ডিএনসিসির অবকাঠামোগত কাজের বড় অংশ এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল। সরকার পরিবর্তনের পরও তারা কাজ পাওয়ায় করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সহায়তা ও দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার ডিএনসিসি প্রশাসকের
প্রকল্পে অনিয়ম, দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের দরপত্র কার্যক্রম ই-জিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানের এসএলটি ও টিডিএস মানদণ্ড পূরণ হয়, নিয়ম মেনেই তারা কাজ পায়। এ প্রক্রিয়ায় কারসাজি বা অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে যুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অন্যান্য পটভূমি সম্পর্কে সিটি করপোরেশন অবগত ছিল না বলেও জানান প্রশাসক।