রসুনের যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতা জানা জরুরি

রান্নার স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে রসুনের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। তবে শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ানোই নয়, রসুনে থাকা বিভিন্ন প্রাকৃতিক যৌগ শরীরের জন্যও উপকারী হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, রসুনের কিছু উপাদান রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমেও এর সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে।
রসুনের উপকারিতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সালফারযুক্ত বিভিন্ন যৌগ। রসুনের কোয়া কাটলে, থেঁতো করলে বা চিবালে এসব যৌগ তৈরি হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যালিসিন। তবে অ্যালিসিন অস্থিতিশীল হওয়ায় তাজা রসুন কাটার বা থেঁতো করার পর অল্প সময়ের জন্য সক্রিয় থাকে। ডায়ালিল ডিসালফাইড ও এস-অ্যালিল সিস্টেইনের মতো যৌগও রসুনের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
১. অল্প ক্যালোরিতে পুষ্টির জোগান
রসুনে ক্যালোরির পরিমাণ কম হলেও এতে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। একটি মাঝারি আকারের রসুনের কোয়ায় (প্রায় ৩ গ্রাম) প্রায় ৪ দশমিক ৫ ক্যালোরি, ০ দশমিক ২ গ্রাম প্রোটিন ও ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে।
এ ছাড়া রসুনে ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, সেলেনিয়াম ও সামান্য পরিমাণ আঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে সাধারণত একবারে অল্প পরিমাণে রসুন খাওয়া হয় বলে এটি এসব পুষ্টির প্রধান উৎস নয়।
২. রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় সহায়ক হতে পারে
রসুনের কিছু যৌগ রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এজড গার্লিক এক্সট্র্যাক্ট (AGE) বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি রসুনের নির্যাস গ্রহণকারীদের ঠান্ডা ও ফ্লুর মৌসুমে কিছু উপসর্গ তুলনামূলক কম গুরুতর ছিল। পাশাপাশি স্কুল বা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির দিনও কম দেখা যায়।
গবেষণায় রসুনের কিছু যৌগের সম্ভাব্য অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্যের কথাও উঠে এসেছে। তবে রসুন খেলে সর্দি-জ্বর বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়—এমন প্রমাণ নেই। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
৩. উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে
উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে রসুনের সাপ্লিমেন্ট উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, রসুনের অ্যালিসিন রক্তচাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখা অ্যাঞ্জিওটেনসিন-২ হরমোনের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া এটি রক্তনালি শিথিল করতেও সহায়ক হতে পারে, ফলে রক্তপ্রবাহ সহজ হয়।
২০২০ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনাতেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রসুনের সাপ্লিমেন্টের সম্ভাব্য উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে। তবে রসুন কোনোভাবেই চিকিৎসকের দেওয়া রক্তচাপের ওষুধের বিকল্প নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে রসুনের ধরন, মাত্রা ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।
৪. খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে
রক্তে অতিরিক্ত এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল জমলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রসুনের সাপ্লিমেন্ট মোট কোলেস্টেরল ও এলডিএল কমাতে সহায়ক হতে পারে।
২০১৬ সালের আরেকটি গবেষণা পর্যালোচনায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে রসুনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সঙ্গে এলডিএল কোলেস্টেরল কিছুটা কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এই ফলাফল সব মানুষের ক্ষেত্রে একই রকম নাও হতে পারে।
অন্যদিকে, রসুনের কারণে ট্রাইগ্লিসারাইড বা এইচডিএল (ভালো) কোলেস্টেরলের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়—এমন ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে
রক্তচাপ ও এলডিএল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রসুনের সম্ভাব্য ভূমিকার কারণে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও এটি উপকারী হতে পারে। তবে রসুন খাওয়ার ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি নির্দিষ্ট হারে কমে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।
সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে রসুন খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলাও হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
সতর্কতা: খাবারে স্বাভাবিক পরিমাণে রসুন খাওয়া অধিকাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত রসুন বা রসুনের সাপ্লিমেন্টে পেটের অস্বস্তি, বুকজ্বালা কিংবা রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের রসুনের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।