বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • শিক্ষকতা, প্রতিবন্ধকতা জয় ও বৃক্ষরোপণে দৃষ্টান্ত, পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর ডেঙ্গুতে ৫ ও হামের উপসর্গে ৭ জনের মৃত্যু, বাড়ছে আক্রান্ত জার্মানিতে কিশোরীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ, রোবটসহ আটক ২ অবসরের আগে দেশের মাঠে বিশ্বকাপ খেলতে মুখিয়ে সিকান্দার রাজা নির্বাচনের পর হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের হিন্দু সম্প্রদায়ের সমস্যা সমাধানে পাশে থাকার আশ্বাস জামায়াত আমিরের পর্যটন উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করতে চায় ইতালি ৯ নভেম্বর বিকেলে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি স্পিকারের সঙ্গে ইউএনডিপি প্রতিনিধির বৈঠক, আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অপারেশন ক্লিনহার্টের মতো অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • ১৯ দিন পর মায়ের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ফুলিকে বাড়িতে পৌঁছে দিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর 

    ১৯ দিন পর মায়ের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ফুলিকে বাড়িতে পৌঁছে দিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর 
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    দীর্ঘ ১৯ দিন চিকিৎসা, সেবা-যত্ন ও অপেক্ষার পর অবশেষে বৃদ্ধা ফুলিকে তাঁর ছেলে ফরিদ মিয়ার কাছে মায়ের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। একই সঙ্গে ফুলির ওষুধ, খাবারসহ এক মাসের প্রয়োজনীয় বাজার ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়া হয়েছে, যাতে বাড়িতে ফেরার পরও তাঁর পরিচর্যায় কোনো ঘাটতি না থাকে।

    মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ আজহার উদ্দিন। এর আগে সোমবার (১২ অক্টোবর) ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ফুলিকে সরাইল উপজেলার নিজসরাইল গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়িতে ফেরার পরও যাতে তিনি অবহেলার শিকার না হন, সে বিষয়ে ফরিদকে সতর্ক করা হয়েছে।

    গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সরাইল সদর ইউনিয়নের নিজসরাইল এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে স্থানীয় যুবকরা ফরিদকে আটক করেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সহযোগিতায় তাঁকে হাসপাতালে অসুস্থ মা ফুলির কাছে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ফরিদ নিজের ভুল বুঝতে পেরে মায়ের প্রতি অবহেলার কথা স্বীকার করেন এবং ক্ষমা চান। ভবিষ্যতে মায়ের দায়িত্ব নেওয়া ও যথাযথ সেবাযত্ন করার প্রতিশ্রুতিও দেন। এর ধারাবাহিকতায় রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে তিনি নিজ হাতে মাকে সেমাই খাওয়ান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফুলির খাবার, পোশাক, পরিচ্ছন্নতা, বিছানার সামগ্রী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন ইলিয়াস মোল্লাসহ সংগঠনটি। তাঁর জন্য দুইটি বালিশ ও কভার, দুইটি রেক্সিন, দুইটি মেসকি, একটি হিজাব, পানিসহ শুকনো খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কারের মতো ব্যক্তিগত পরিচর্যার দায়িত্বও পালন করেছেন তাঁরা।

    জানা গেছে, পেশায় রাজমিস্ত্রির জোগালি ফরিদের স্ত্রী ও সন্তানও তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। তবে মায়ের কাছে ফিরে এসে তাঁর দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করায় ফুলির ভবিষ্যৎ পরিচর্যা নিয়ে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১৯ দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন থাকার পর ফুলিকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর পাশে থাকার দায়িত্ব পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। পাশাপাশি ওষুধ, খাবার ও এক মাসের প্রয়োজনীয় বাজারের ব্যবস্থা করে সংগঠনটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে, যাতে বাড়িতে ফিরে ফুলি প্রয়োজনীয় সেবা ও পরিচর্যা পান।

    ফুলিকে ছেলের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে মানসিক প্রশান্তির কথা জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন বলেন, “ফুলিকে তাঁর সন্তানের কাছে তুলে দিতে পেরে আমি মানসিকভাবে অনেক শান্তি পেয়েছি। দীর্ঘ ১৯ দিন তাঁর চিকিৎসা, খাবারের ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কারের মতো ব্যক্তিগত সেবার দায়িত্ব পালন করেছি। এত দিনের পরিশ্রম ও কষ্ট আজ সার্থক হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। “আমরা চাই, ফুলি যেন জীবনের বাকি সময়টুকু সন্তানের স্নেহ ও যত্নে কাটাতে পারেন। তাঁর ও ফরিদের জন্য এক মাসের প্রয়োজনীয় বাজার করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওষুধ, ফলমূল ও শুকনো খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়িতে ফেরার পরও তাঁদের প্রয়োজনের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখব। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”

    ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, “বৃদ্ধা ফুলি দীর্ঘদিন আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময় চিকিৎসক ও নার্সরা আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁকে চিকিৎসা ও সেবা দিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিনিধিরাও প্রতিদিন তাঁর খোঁজখবর রেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ফুলি বাড়িতে ফিরে গেছেন, এ খবর শুনে সত্যিই ভালো লাগছে। অসহায় একজন মানুষের পাশে এভাবে দাঁড়ানো প্রশংসনীয় উদ্যোগ।”

    ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেন, “বৃদ্ধা ফুলি দীর্ঘদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি নিজে উপস্থিত থেকে ফরিদের কাছে তাঁর মাকে হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। পরে বাতিঘরের অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। “ফরিদকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে, সে যেন মায়ের প্রতি কোনো ধরনের অবহেলা না করে এবং তাঁর ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। ভবিষ্যতে মায়ের প্রতি অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. জালাল উদ্দিন ফাহিম (পিপিএম-সেবা) বলেন, “বৃদ্ধা ফুলির বিষয়টি আমি অবগত ছিলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর দীর্ঘদিন ধরে তাঁর চিকিৎসা ও সেবাযত্নের দায়িত্ব পালন করেছে। সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে বাড়িতেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম সচরাচর চোখে পড়ে না।
    “বেওয়ারিশ লাশ দাফন এবং অজ্ঞাতপরিচয় ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মানবিক কাজে সংগঠনটির পাশে জেলা পুলিশ সব সময় থাকবে।”

    উল্লেখ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ফরিদ তাঁর মা ফুলিকে সরাইলের বড্ডাপাড়া গরুর বাজারের সামনে ফেলে রেখে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর টানা চার দিন ওই গরুর বাজারেই পড়ে ছিলেন অসুস্থ বৃদ্ধা। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় সেখানে পড়ে থাকতে দেখে সরাইল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
    সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সচালক জাকিরুল ইসলাম ও স্বাস্থ্যকর্মী রাসেল চৌধুরী তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে তাঁকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে সংগঠনটির উদ্যোগে তাঁর চিকিৎসা, খাবার ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়।

    বৃদ্ধা ফুলির পরিচয়, স্বামী ও সন্তানের নাম জানা ছিল। তাঁর স্বামীর নাম সিদ্দিক মিয়া এবং ছেলের নাম ফরিদ মিয়া। তাঁদের বাড়ি সরাইল উপজেলার সদর ইউনিয়নের নিজসরাইল এলাকায়। প্রাথমিকভাবে তাঁর ঠিকানা নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে নিজসরাইলের আলিনগর এলাকার তথ্য জানা যায়। পরিচয় ও স্বজন থাকার পরও দীর্ঘ সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাওয়া যায়নি। এর আগেও তিনি অসুস্থ অবস্থায় সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সে সময় তাঁর ছেলে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁর খোঁজ নিতে আসেননি বলে অভিযোগ ওঠে।

    একপর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর তাঁর চিকিৎসা ও পরিচর্যার দায়িত্ব নেয়। দীর্ঘ ১৯ দিনের চিকিৎসা ও সেবাযত্ন শেষে এবার সংগঠনটির উদ্যোগে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। সঙ্গে দেওয়া হলো এক মাসের বাজার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ, যাতে বাড়িতে ফিরে খাবার ও চিকিৎসার সংকটে পড়তে না হয় তাঁকে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন