হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে বড় অভিযানের পরিকল্পনা সৌদি আরবের

ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীকে সামনে রেখে একাধিক ফ্রন্টে একযোগে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থল অভিযানে নেতৃত্ব দেবে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী এবং তাদের সহায়তায় সৌদি আরব বিমান হামলা চালাবে।
অভিযানের পরিধি অনুযায়ী এক লাখের বেশি ইয়েমেনি যোদ্ধা বা সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয় ব্যক্তি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সৌদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছে। কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশও সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে এসব দেশ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সৌদি পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হুথিরা উপকূলীয় এলাকা ধরে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
পরিকল্পনায় দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলে জানা গেছে। এর একটি হলো বাব আল-মান্দেবের আশপাশে সীমিত আকারে অভিযান চালানো। অন্যটি হলো আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ একাধিক প্রদেশে একই সময়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা।
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যপথ। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
একজন পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, বাব আল-মান্দেব হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের সঙ্গে নতুন করে শান্তি আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয় রিয়াদ।
অভিযানের সুনির্দিষ্ট সময় এখনো নির্ধারিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অথবা নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অভিযান শুরু হতে পারে।
সৌদি আরবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, এবারের সম্ভাব্য অভিযান ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় সীমিত হতে পারে। তার মতে, উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল করে ওই অঞ্চলে স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত করাই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহায়তা
এক পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি বিমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পরামর্শ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। তবে রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, পাকিস্তান ইয়েমেনের এডেনে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক পরামর্শকেরাও ইয়েমেনে সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। তুরস্কের ড্রোনও ইয়েমেনে মোতায়েন করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়াও রিয়াদের অন্যতম উদ্বেগ। এক পাকিস্তানি কর্মকর্তার দাবি, সৌদি আরবের স্থলসীমান্ত সুরক্ষা এবং ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে পাকিস্তান ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। তবে ইয়েমেনে যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তিনি জানান।
এদিকে ফ্রান্সও লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় সৌদি আরবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভক্ত ইয়েমেনি বাহিনীর ওপর নির্ভরতা
ইয়েমেনে সম্ভাব্য স্থল অভিযানে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পাওয়া বিভিন্ন ইয়েমেনি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে হবে সৌদি আরবকে।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের জন্য হুথিবিরোধী অনেক বাহিনী এখনো পর্যাপ্তভাবে সংগঠিত বা প্রস্তুত নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলে ভূখণ্ড দখল ও বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ নিলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। পরে ওই বাহিনী পরাজিত হয়।
সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি শিহাবির মতে, হুথিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় স্থলবাহিনীর কার্যক্রমের ওপর।
সূত্র: রয়টার্স