জাতিসংঘে ভাষণে যেসব মিথ্যা দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রথম দিন মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় ৩৭ মিনিটের ভাষণে ইরান যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড, জলবায়ু পরিবর্তন, ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিশ্বশান্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
ট্রাম্পের ভাষণকে গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম বিস্ফোরক মনে করেছেন বিশ্লেষকেরা। তবে ভাষণে তাঁর বেশ কিছু দাবির সঙ্গে বিদ্যমান তথ্যের মিল পাওয়া যায় না বলে বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ট্রাম্প বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আটটি যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। তবে তাঁর তালিকায় থাকা কয়েকটি ঘটনা সরাসরি যুদ্ধ ছিল না এবং কয়েকটি সংঘাতও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাঁর উল্লেখ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, সার্বিয়া-কসোভো, রুয়ান্ডা-কঙ্গো, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান, গাজা, ইসরায়েল-ইরান এবং মিসর-ইথিওপিয়া।
মিসর ও ইথিওপিয়ার বিরোধ ছিল মূলত একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধ। একইভাবে সার্বিয়া ও কসোভোর পরিস্থিতিকেও যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর সংঘাতও পুরোপুরি শেষ হয়নি; ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সেখানে একটি শান্তি চুক্তি হয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আবার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্যে তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে। তিনি বলেন, একসময় যারা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে বলে সতর্ক করেছিল, তারাই পরে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ শব্দটি বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ করেছে। তাঁর দাবি, পৃথিবী উষ্ণ না হয়ে ঠান্ডা হচ্ছিল।
তবে জলবায়ুবিজ্ঞানীরা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ ও ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’—দুটি শব্দই ব্যবহার করেন। দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতাকে বোঝাতে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বলা হয়। আর এর ফলে জলবায়ু ব্যবস্থায় যে বিস্তৃত পরিবর্তন ঘটে, তা বোঝাতে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর হলো সর্বশেষ ১১ বছর। এর মধ্যে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছর। ফলে পৃথিবী ঠান্ডা হওয়ার দাবি বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২০১৮ সালের একটি জলবায়ু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। সেখানে ১২ বছরের মধ্যে পৃথিবীর সবাই মারা যাবে—এমন কোনো পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি।
ভাষণে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন বিশ্বজুড়ে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে। তবে এই দাবির পক্ষে হোয়াইট হাউস কোনো স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য হিসাব দেয়নি। ভাষণের সময় হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা হিসেবে ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কথা উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার নিয়েও ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার দাবি সত্য নয়। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত বেশি অস্ত্র রয়েছে যে সেগুলো কখনো ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
তবে অস্ত্রের মজুতের সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয় না। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ওপর নজরদারি করা সরকারি পরিদর্শক সংস্থা এবং নির্দলীয় কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্রের মজুত কমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেন্টাগন বিভিন্ন পদক্ষেপও নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজধানীতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে। তবে স্থানীয় পুলিশের পরিসংখ্যানের সঙ্গে এই দাবির মিল নেই।
ওয়াশিংটন পুলিশের হিসাবে, সোমবার পর্যন্ত চলতি বছরে ১৫ হাজারের বেশি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ২৩ শতাংশ কম। ফলে ট্রাম্পের দাবি করা ৮৭ শতাংশ হ্রাসের সঙ্গে পুলিশের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বড় পার্থক্য রয়েছে।
এ ছাড়া ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে অপরাধ ৮১, ৮৮ বা ৯২ শতাংশ কমেছে—ট্রাম্পের এমন বিভিন্ন দাবির পক্ষে হোয়াইট হাউস নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি।