বিবেক যেখানে স্বার্থপর, নীতিকথা সেখানে হাস্যকর

মানুষের মুখে নীতিকথার অভাব নেই। কে কীভাবে চলবে, কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়—এসব নিয়ে আমরা খুব সহজেই অন্যকে উপদেশ দিতে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই কথাগুলো আমরা নিজের জীবনে কতটা মানি?
সমস্যাটা শুরু হয় ঠিক সেখানেই। যখন বিবেক নিজের স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে যায়, তখন নীতিকথাগুলোও ধীরে ধীরে হাস্যকর হয়ে ওঠে।
অন্যের ভুল দেখলে আমরা ন্যায়-অন্যায়ের বড় বিচারক হয়ে উঠি। কেউ মিথ্যা বললে তাকে অসৎ বলি, কেউ অন্যায় করলে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলি। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে নিজের স্বার্থ জড়িয়ে গেলে অনেক সময় সেই অন্যায়কেই যুক্তি দিয়ে বৈধ করে ফেলি। তখন নীতি আর নীতি থাকে না, হয়ে যায় সুবিধামতো ব্যবহার করা একটি শব্দ।
আমরা চাই অন্যরা সৎ হোক, কিন্তু নিজের অসততার জন্য হাজারটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাই। চাই অন্যরা প্রতিশ্রুতি রাখুক, অথচ নিজের দেওয়া কথা ভাঙার সময় বলি—‘পরিস্থিতি এমন ছিল।’ অন্যের স্বার্থপরতা আমাদের চোখে অপরাধ, আর নিজের স্বার্থপরতা হয়ে যায় ‘বাস্তবতা’।
এভাবেই বিবেকের সঙ্গে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতারণা শুরু হয়।
বিবেক আসলে তখনই বিবেক, যখন তার সামনে নিজের স্বার্থও দাঁড়িয়ে থাকলেও সে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে। নিজের ক্ষতি হতে পারে জেনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস যেখানে থাকে, সেখানেই নৈতিকতার সত্যিকারের মূল্য।
কারও সামনে ভালো মানুষ সাজা খুব সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দর কথা লেখা, অন্যকে মানবিকতার শিক্ষা দেওয়া কিংবা ন্যায়-অন্যায় নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেওয়াও কঠিন কিছু নয়। কঠিন হলো—কেউ দেখছে না, জানছে না, তবুও সঠিক কাজটি করে যাওয়া।
কারণ চরিত্রের পরীক্ষা মানুষের সামনে নয়, বরং একান্ত নির্জনতায় হয়। যখন অন্যায় করে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে এবং কেউ জানতে পারবে না—সেই মুহূর্তে মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই তার প্রকৃত পরিচয়।
স্বার্থ মানুষের জীবনের অংশ। নিজের প্রয়োজন, ভবিষ্যৎ কিংবা প্রিয়জনের কথা ভাবা অপরাধ নয়। কিন্তু যখন স্বার্থের জন্য সত্যকে অস্বীকার করি, অন্যের অধিকার কেড়ে নিই, সম্পর্ককে ব্যবহার করি কিংবা নিজের ভুলকে নীতির পোশাক পরিয়ে দিই—তখন সমস্যা তৈরি হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মানুষ একসময় নিজের মিথ্যাকেও বিশ্বাস করতে শুরু করে। বারবার নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি দিতে দিতে বিবেকের কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে যায়। তখন নীতিকথা শুধু অন্যকে শোনানোর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, নিজের জন্য নয়।
তাই নীতিকথা বলার আগে নিজের দিকে তাকানো জরুরি। আমি যে ন্যায়বোধের কথা অন্যকে শেখাচ্ছি, তা কি আমার নিজের জীবনেও আছে? আমি যে সততার প্রশংসা করছি, নিজের স্বার্থের সময় কি সেই সততাকে ধরে রাখতে পারি?
জীবনে বড় বড় কথা বলার চেয়ে ছোট ছোট জায়গায় সৎ থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারও প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, ভুল করলে স্বীকার করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, দুর্বল মানুষের সুযোগ না নেওয়া কিংবা নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি না করা—এসবই বিবেকবান হওয়ার বাস্তব প্রমাণ।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ তার কথায় নয়, তার সিদ্ধান্তে পরিচিত হয়।
বিবেক যদি স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তাহলে মুখের নীতিকথা যত সুন্দরই হোক, তার কোনো মূল্য থাকে না। আর বিবেক যদি সত্যের পাশে দাঁড়াতে পারে, তাহলে নীতিকথা বলার প্রয়োজনও অনেক কমে যায়—মানুষের আচরণই তখন তার সবচেয়ে বড় বক্তব্য হয়ে ওঠে।