সঠিক পথে এলেই শয়তান কেন বাধা দিতে শুরু করে?

মানুষ যখন ভুল ও পাপের পথে থাকে, তখন তাকে সেই পথেই ধরে রাখতে শয়তানের খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় না। বরং মানুষ যখন সঠিক পথে ফিরতে চায়, তখনই শুরু হয় শয়তানের নানা ধরনের প্ররোচনা। ইসলামী বক্তা নোমান আলী খানের বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিম বা সরল পথ থেকে দূরে রাখাই শয়তানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে শয়তানের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব। তারপর তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত ১৬-১৭)
এই আয়াতের আলোকে শয়তানের চারদিক থেকে আক্রমণের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। নোমান আলী খানের বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষ যখন ভালো কাজের দিকে এগোতে শুরু করে, তখন শয়তান নানা কৌশলে তাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
সামনে থেকে বাধা
কোনো মানুষ ভালো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে শুরুতেই তার সামনে নানা ধরনের বাধা তৈরি হতে পারে। তখন তার মনে দ্বিধা তৈরি হয়—সে কি সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করবে, নাকি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে?
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি ঘুষ নেওয়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তার সামনে কর্মক্ষেত্রে নানা চাপ বা সমস্যা তৈরি হতে পারে। শয়তান মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে, ভালো হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই তার জীবনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে ভয় বা হতাশায় সে আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
সঠিক পথে আসার শুরুটা তাই সবসময় সহজ নাও হতে পারে। নতুন সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরীক্ষা, চাপ ও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
পেছন থেকে পুরোনো জীবনে ফেরানোর চেষ্টা
শয়তানের আরেকটি কৌশল হলো মানুষের অতীতকে সামনে এনে তাকে পুরোনো জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া। তখন মনে হতে পারে, ‘আগের জীবনই তো ভালো ছিল, এখন এত নিয়মকানুন মেনে চলার কী দরকার?’
পুরোনো বন্ধু, আড্ডা কিংবা অতীতের আনন্দের স্মৃতি মনে করিয়ে মানুষকে আবার সেই পরিবেশে ফেরানোর চেষ্টা করা হতে পারে। অথচ সে হয়তো আগে বুঝতে পেরেছিল যে ওই পরিবেশ তাকে গিবত, পরচর্চা কিংবা অন্য কোনো পাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আবার অতীতের পাপের কথাও শয়তান মানুষের মনে বারবার জাগিয়ে তুলতে পারে। তখন তার মনে হতে পারে, ‘আমি এত পাপ করেছি, আমার আর ভালো হওয়ার সুযোগ নেই। নামাজ, দোয়া বা রোজা করেই বা কী লাভ?’
এ ধরনের হতাশা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অথচ একজন মানুষ যত ভুলই করুক, তওবার দরজা তার জন্য খোলা থাকে। তাই অতীতের ভুলকে শিক্ষা হিসেবে নেওয়া উচিত, হতাশার কারণ হিসেবে নয়।
ভালো কাজের মধ্যেও অহংকার ঢুকিয়ে দেওয়া
শয়তানের সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্ররোচনাগুলোর একটি হলো ভালো কাজের সঙ্গে অহংকার ও আত্মতুষ্টি মিশিয়ে দেওয়া।
কেউ যখন নামাজ, পর্দা, দাড়ি, দ্বীনি জ্ঞান বা অন্য কোনো ভালো আমল শুরু করেন, তখন তার মনে এমন ভাবনা আসতে পারে যে তিনি অন্যদের চেয়ে ভালো হয়ে গেছেন। ফলে নিজের আমল নিয়ে অহংকার তৈরি হয় এবং অন্যদের ছোট করে দেখার প্রবণতা জন্ম নেয়।
অথচ ইসলামের অন্যতম শিক্ষা হলো বিনয়। নিজের ভালো কাজ নিয়ে অহংকার না করে বরং আল্লাহর কাছে আমল কবুলের জন্য দোয়া করা উচিত।
কাবাঘর নির্মাণের সময় হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর দোয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তাঁরা এত বড় একটি নেক কাজ করার পরও আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন।’ অর্থাৎ ভালো কাজ করলেই নিজেকে নিশ্চিতভাবে সফল বা অন্যদের চেয়ে উত্তম মনে করার সুযোগ নেই।
খারাপ কাজকে আকর্ষণীয় করে তোলা
শয়তানের আরেকটি কৌশল হলো পাপ ও অন্যায়কে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা। খারাপ কাজকে সুন্দর নাম দেওয়া, নানা অজুহাত দাঁড় করানো কিংবা সেটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আনন্দের অংশ হিসেবে তুলে ধরা এর একটি পদ্ধতি হতে পারে।
তখন মানুষ নিজেকেই বোঝাতে শুরু করে, ‘আমি কি একটু আনন্দ করতে পারি না?’ এভাবে ধীরে ধীরে অন্যায় কাজও স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।
কিন্তু কোনো কাজের নাম পরিবর্তন করলেই তার প্রকৃতি বদলে যায় না। অন্যায় অন্যায়ই থাকে এবং পাপকে সুন্দর ভাষায় উপস্থাপন করলেও তার পরিণতি বদলায় না।
লক্ষ্য একটাই—মানুষকে অকৃতজ্ঞ করে তোলা
শয়তানের এসব প্ররোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ করে তোলা। মানুষ যেন তার জীবনে পাওয়া নিয়ামতের দিকে না তাকিয়ে কেবল যা পায়নি, যা হারিয়েছে কিংবা যে ঘাটতি রয়েছে, সেদিকেই মনোযোগ দেয়—এটাই শয়তানের অন্যতম লক্ষ্য।
তাই সঠিক পথে চলতে হলে শুধু পাপ থেকে দূরে থাকাই যথেষ্ট নয়; নিজের ভালো কাজ নিয়েও অহংকার থেকে বাঁচতে হবে। অতীতের ভুলের জন্য হতাশ না হয়ে তওবা করতে হবে, পরীক্ষার সময় ধৈর্য ধরতে হবে এবং জীবনে পাওয়া নিয়ামতের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভালো পথে আসার পরও নিজেকে নিরাপদ মনে না করে আল্লাহর সাহায্য ও হেদায়েতের জন্য নিয়মিত দোয়া করা। কারণ মানুষের জীবনে সঠিক পথে থাকার সংগ্রাম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই পথে অটল থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল: রেডিও আজাদ