শীতে ইউক্রেনকে ‘ভেঙেচুরে ফেলতে পারে’ রাশিয়া, তার আগেই যুদ্ধবিরতির আশা জেলেনস্কির

আসন্ন শীতেই ইউক্রেন–রাশিয়ার যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে দুই দেশ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে। একই সঙ্গে বৃহত্তর শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আবারও আলোচনা শুরু করার চেষ্টা চলছে। গতকাল সোমবার অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
জেলেনস্কি মনে করেন, শীত শুরু হওয়ার আগের কয়েক সপ্তাহ কূটনৈতিক উদ্যোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আরও একটি ভয়াবহ শীতের ওপর নির্ভর করছেন, যাতে ইউক্রেন দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে জেলেনস্কি বলেন, পুতিনের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রয়োজন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অসন্তুষ্ট করতে চান না, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমার অনুভূতি হলো, পুতিনের ট্রাম্পকে প্রয়োজন। তিনি তাকে বিরক্ত করতে চান না।’ পুতিন যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে না চাইলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাকে সে পথে যেতে চাপ দিতে পারে বলেও জানান জেলেনস্কি। পুতিন মার্কিন নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে কোনো কূটনৈতিক সাফল্য এনে দিতে চাইতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, ‘হ্যাঁ।’
গত রোববার কিয়েভে ট্রাম্পের দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলেনস্কি। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম তারা ইউক্রেন সফর করেন। এর আগে শনিবার মস্কোর ক্রেমলিনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তিন ঘণ্টার বৈঠক করেন কুশনার ও উইটকফ। এরপর তাঁরা কিয়েভে যান।
জেলেনস্কি জানান, মার্কিন দূতদের কাছ থেকে তিনি যে বার্তা পেয়েছেন তা হলো, ‘রাশিয়ানরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত।’ তবে এ বিষয়ে তিনি এখনো সন্দিহান। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার কর্মকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক হামলা বৃদ্ধি কোনো ধরনের সমঝোতার ইচ্ছার প্রমাণ দিচ্ছে না। তারপরও মার্কিন দূতদের মস্কো সফরের পর জেলেনস্কির ধারণা হয়েছে, পুতিন আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধারণা ‘আলোচনা করতে প্রস্তুত।’
জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দূতরা মস্কো ও কিয়েভে মূলত কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ‘আনব্লক’ বা সচল করার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলেন। তবে তারা কিছু নতুন ধারণাও নিয়ে এসেছেন। তিনি সব বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তবে বলেন, শীতের আগে এবং শীতকাল চলাকালে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্ভাব্য উত্তেজনা কমানোর কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘জ্বালানি স্থাপনা নিয়ে কিছু ধারণা আছে, শস্য পরিবহন নিয়ে আছে, বিদ্যুৎ স্থাপনা এবং তেল ও গ্যাস রপ্তানি নিয়েও আছে। রাশিয়া ও আমাদের স্বার্থ ভিন্ন।’ আলোচনায় উঠে আসা মার্কিন উদ্যোগের মধ্যে একদিকে আবারও শান্তি আলোচনা শুরু করা এবং অন্যদিকে এমন কিছু সমঝোতা তৈরির চেষ্টা রয়েছে কি না, যাতে ইউক্রেন ও রাশিয়া বড় ধরনের উত্তেজনা ছাড়াই আসন্ন শীত পার করতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, এই ব্যাখ্যাটি ‘আলোচনাগুলোর বাস্তবতার খুব কাছাকাছি।’
তিনি বলেন, প্রথম লক্ষ্য হলো আলোচনা আবার শুরু করা। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো আসন্ন শীতকে আগের শীতগুলোর চেয়ে ভিন্ন করা। এর আগের শীতগুলোতে রাশিয়ার ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা যুদ্ধের পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। জেলেনস্কির মতে, লক্ষ্য হবে শীতের আগে অথবা শীতের সময় এমন কিছু পদক্ষেপ খুঁজে বের করা, ‘যা দুই পক্ষকে শান্তির আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।’
মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, শীতের আগে রাশিয়া ও ইউক্রেনের উভয় পক্ষের স্বার্থের সমাধান করা সম্ভব হবে কি না, তা তারা জানেন না। এর আগে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা কিংবা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ করার অসংখ্য উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।
জেলেনস্কি জানান, মার্কিন দল এখন ট্রাম্পকে তাদের আলোচনার বিষয়ে অবহিত করবে। এরপর তারা ইউক্রেন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি আলাদা ‘উইন্টার প্যাকেজ’ বা শীতকালীন সহায়তা প্যাকেজকেও সমর্থন করছে। এতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সহায়তা থাকবে। জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় নয়। এর মধ্যে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) রয়েছে...এবং উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপও রয়েছে।’
জেলেনস্কির বিশ্বাস, পুতিন শীতকে কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের ওপর এতটা ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিতে চান, যাতে কিয়েভ আরও ছাড় দিতে বাধ্য হয়। জেলেনস্কি বলেন, ‘রাশিয়া সত্যিই মনে করে, এই শীত তাদের আমাদের ভেঙেচুরে ফেলতে সাহায্য করতে পারে।’ তাঁর ভাষ্য, মস্কো আশা করছে বড় ধরনের শীতকালীন অভিযান এবং ইউক্রেনের অবকাঠামোর ওপর হামলা দেশটির ওপর একটি ‘শক্তিশালী ধাক্কা’ দেবে। এরপর ইউক্রেন আরও বেশি আপস করতে বাধ্য হবে।
জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেন, ইউক্রেন ইতোমধ্যে যতটা আপস করতে পারে, ততটাই করেছে। তার মতে, যেকোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং একটি অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজও থাকতে হবে। একই সঙ্গে জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, শীতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় রাশিয়াও নিজস্ব ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনও রাশিয়ার অর্থনীতিতে আঘাত করতে পারে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘তারা যখন আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় হামলা করেছে, তখন আমরা তাদের তেল ও গ্যাস বিক্রির সক্ষমতা বন্ধ করে দিয়েছি।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানি ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।
জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেন সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে চায়। এ মাসের শেষ দিকে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে আরও আলোচনার সম্ভাব্য একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে আরেকটি ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের হাতে এই সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর আছে, যেকোনোভাবে কথা বলার পথ খুঁজে বের করার জন্য। সংলাপ ছাড়া...আমরা কোনো ফল পাব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠান্ডা শীত শুরু হওয়ার আগে আলোচনার প্রক্রিয়ার একটি বাস্তব সূচনা করার পথ খুঁজে বের করতে পারেন।’
জেলেনস্কি বলেন, যেকোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সময়ও ইউক্রেনকে সামরিকভাবে শক্তিশালী থাকতে হবে। তার দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন এখন আগের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে দেশটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং রাশিয়ার অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে রয়েছে। আলোচনায় চাপ তৈরির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে রাশিয়ার ওপর আরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বানও জানিয়েছেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ‘পুতিনের অর্থ প্রয়োজন। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পুতিন অর্থ চান।’