এআই ক্যামেরার নজরদারিতে বদলে যাচ্ছে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিত্র

দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরা চালুর পরই ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রবণতায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। প্রথম দিনে ৪৪৬টি মামলা হলেও পরদিন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪২টিতে। অর্থাৎ মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মামলা কমেছে প্রায় ৯১ শতাংশ।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এআই ক্যামেরা চালুর প্রথম দিন মঙ্গলবার অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো ও উল্টো পথে চলার অভিযোগে মোট ৪৪৬টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৪১৭টি মামলা হয়েছে নির্ধারিত গতিসীমার চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। এসব মামলার মধ্যে কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৯৭টি এবং গাজীপুর অঞ্চলে ২০টি মামলা হয়েছে।
এ ছাড়া উল্টো পথে গাড়ি চালানোর ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৯টি। এর মধ্যে গাজীপুর অঞ্চলে ২৩টি এবং কুমিল্লা অঞ্চলে ছয়টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়।
তবে ক্যামেরা চালুর দ্বিতীয় দিন বুধবার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই দিন গাজীপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগে মাত্র ৪২টি মামলা হয়েছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানোর কোনো ঘটনাই ক্যামেরায় শনাক্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম দিনের মামলার পর চালকদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হওয়ায় পরদিনই আইন লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এআইভিত্তিক নজরদারি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশের আওতায় সারা দেশের মহাসড়ক আটটি অঞ্চলে বিভক্ত। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের এআই ক্যামেরা স্থাপন করা অংশ গাজীপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত অংশ গাজীপুর অঞ্চলের এবং দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত অংশ কুমিল্লা অঞ্চলের আওতাধীন।
হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ছে কি না এবং দুর্ঘটনা কমছে কি না, তা নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন করা হবে। এরই মধ্যে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে এবং এআই ক্যামেরার উদ্যোগ সফল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হয়ে মামলা হচ্ছে। এতে মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। মামলা হওয়ার পর চালকের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্তা চলে যাচ্ছে এবং জরিমানা পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে মামলা এড়ানোর সুযোগও থাকছে না।
হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে ১ হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মহাসড়কের দুই পাশে ৪৯০টি খুঁটিতে এসব ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ক্যামেরাগুলো একটি ডেটা সেন্টার ও পাঁচটি মনিটরিং সেন্টারের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ১৪২ কোটি টাকার কিছু বেশি।
এসব ক্যামেরার মাধ্যমে নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালানো, উল্টো পথে চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল, ট্রাফিক সাইন ও সিগন্যাল অমান্য এবং অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন ধরনের আইন লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও রেকর্ড করা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মহাসড়কে সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানোর বিধান রয়েছে। নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং উল্টো পথে গাড়ি চালালে ৩ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, বেপরোয়া গতির কারণে তার এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। এআই ক্যামেরা চালুর পর দ্বিতীয় দিনে গাড়ির গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত মনে হয়েছে।
মোটরসাইকেলচালক আমিরুল ইসলামও জানান, মামলা এড়াতে তিনি এখন আগের চেয়ে বেশি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এআই ক্যামেরা ব্যবহারের সুফল পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন। মহাসড়কে নির্ধারিত গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে মালিক ও চালকদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি না চালানোর বিষয়ে আগেই সব গাড়িতে সার্কুলার দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মামলা ও জরিমানার কারণে চালকেরা এখন আরও সতর্ক হবেন। পাশাপাশি গাড়ির ফিটনেস বা লাইসেন্স নবায়নের সময় ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্য যাচাই করা গেলে চালকদের আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে ভবিষ্যতে সড়কে অনিয়ম আরও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এআই ক্যামেরার এই প্রযুক্তি শুধু মামলা ও জরিমানা আদায়ের মাধ্যম নয়, বরং চালকদের আচরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়। তবে উদ্বোধনের মাত্র দুই দিনের পরিসংখ্যান বলছে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মহাসড়কে সতর্কতার মাত্রা বেড়েছে।