ব্লক নয়, নীরব দূরত্ব—তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘সফট ব্লকিং’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্ত এখন সহজেই সবার সামনে চলে আসে। কোথায় ঘুরতে গেলেন, কোন রেস্তোরাঁয় খেতে গেলেন কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে কী ঘটছে—এসবের অনেকটাই জানতে পারেন আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতরা। তবে সবাইকে নিজের জীবনের সব তথ্য জানাতে চান না অনেকেই। বিশেষ করে কারও অতিরিক্ত নজরদারি বা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে অস্বস্তি তৈরি হলে সরাসরি ব্লক করার কথাও মনে হতে পারে। কিন্তু সম্পর্কের কারণে অনেক সময় সেটিও করা সম্ভব হয় না।
এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি ব্লক না করেই অনলাইনে দূরত্ব তৈরির কৌশল বেছে নিচ্ছেন অনেক তরুণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রাইভেসি সেটিংস ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করার এই পদ্ধতিই পরিচিত ‘সফট ব্লকিং’ নামে।
কী এই সফট ব্লকিং
কাউকে সরাসরি ব্লক না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ ও দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেওয়াই সফট ব্লকিং। এতে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করেও নিজের অনলাইন পরিসরকে ব্যক্তিগত রাখা যায়।
কোনো ব্যক্তির পোস্ট বা স্টোরি নিজের ফিডে না দেখতে চাইলে তাকে মিউট করা যায়। একইভাবে নিজের পোস্ট, স্টোরি বা অন্যান্য কার্যক্রম নির্দিষ্ট কারও কাছ থেকে আড়াল রাখার সুযোগও রয়েছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে।
এ ছাড়া কাউকে আনফলো করা, অনুসারীর তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা তার সঙ্গে মেসেজ আদান-প্রদান কমিয়ে দেওয়াও সফট ব্লকিংয়ের অংশ হতে পারে। অর্থাৎ সরাসরি ব্লকের মতো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ধীরে ধীরে অনলাইন যোগাযোগের পরিধি কমিয়ে দেওয়া।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায়
ব্যক্তিগত জীবনের সব তথ্য সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান না অনেকেই। কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন বা কী করছেন—এসব তথ্য নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখতে সফট ব্লকিং বেছে নিতে পারেন কেউ কেউ।
বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতদের অতিরিক্ত কৌতূহল কিংবা ব্যক্তিগত বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ এড়াতে এটি কার্যকর মনে হতে পারে।
সরাসরি বিরোধ এড়াতে
কাউকে ব্লক করলে বিষয়টি সহজেই চোখে পড়ে। এতে পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নানা প্রশ্ন, তর্ক কিংবা মনোমালিন্যও হতে পারে। তাই সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট না করে অনলাইনে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে সফট ব্লকিংয়ের পথ বেছে নেন অনেকে।
এতে কি উল্টো কষ্ট বাড়ে
সরাসরি ব্লক করার বিষয়টি পরিষ্কার হলেও সফট ব্লকিং অনেক সময় অস্পষ্ট। ফলে যার সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে, তিনি বুঝতে পারেন না কেন হঠাৎ যোগাযোগ কমে গেল বা কেন তার কাছ থেকে কিছু তথ্য আড়াল করা হচ্ছে।
এতে তার মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—তিনি কি কোনো ভুল করেছেন, কেন তাকে এড়িয়ে চলা হচ্ছে কিংবা সম্পর্কের মধ্যে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না। কাছের বন্ধু, আত্মীয় বা প্রিয়জনের ক্ষেত্রে এমন অনিশ্চয়তা মানসিক অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সব ক্ষেত্রে কি সফট ব্লকিং ভালো
এর উত্তর নির্ভর করে পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যের ওপর। কোনো সম্পর্কের ইতি টানার পর নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে অনলাইনে দূরত্ব তৈরি করা ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষার একটি উপায় হতে পারে।
তবে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দেওয়া, অপরাধবোধ তৈরি করা কিংবা নিজের প্রতি তার মনোযোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সফট ব্লকিং ব্যবহার করা হলে তা মানসিক নিয়ন্ত্রণের কৌশলে পরিণত হতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী সীমারেখা তৈরি করুন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সেখানে নিজের সব তথ্য সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বস্তির জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন সীমারেখা তৈরি করা স্বাভাবিক।
তবে দীর্ঘদিনের বন্ধু, আত্মীয় বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে হঠাৎ নীরবে দূরত্ব বাড়ানোর বদলে প্রয়োজনে খোলাখুলি কথা বলাই ভালো। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দূরত্ব তৈরি করা সহজ হলেও, সম্পর্কের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে অনেক সময় সরাসরি কথোপকথনের বিকল্প নেই।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, মিডিয়াম