বিচারকের আসন ছাড়ছি, ন্যায়ের আদর্শ নয়: বিচারপতি আশফাকুল

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেছেন, বিচারকের দায়িত্ব থেকে অবসর নিলেও ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে কখনো সরে যাবেন না। সংবিধান, আইনের শাসন ও দেশের প্রতি তার অঙ্গীকার আজীবন অটুট থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে শেষ কর্মদিবসে দেওয়া বিদায়ী বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন উপস্থিত ছিলেন।
বিদায়ী বক্তব্যে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে।’
তিনি বলেন, একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়। তার দায়িত্ব সংবিধান, আইন এবং নিজের বিবেকের প্রতি। বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষা ও জনগণের আস্থা ধরে রাখাই বিচারকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালন শেষে আজ তার বিচারিক জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হচ্ছে। তবে এটি কেবল অবসর নয়, বরং আইনাঙ্গনে চার দশকের বেশি সময়ের পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সমাপ্তি।
বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগ শুধু বিচারক বা আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সবার। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাই মিলে এই প্রতিষ্ঠানের অংশ। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
অবসর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয়। সামর্থ্য থাকা পর্যন্ত দেশের কল্যাণে এবং বিচার বিভাগের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবেন তিনি।
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ সততা, চরিত্র ও অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল হওয়ায় নিয়মিত পড়াশোনা, সংবিধান, আইন ও দেশি-বিদেশি রায় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, মামলাজট কমানো, বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করা এবং মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করা এখন বড় দায়িত্ব। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সহজলভ্য করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা পর্যায়ের বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সব সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে ন্যায়ের পক্ষে থাকতে হবে। জনগণের আস্থা ধরে রাখাই বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি বলেন, সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়, এটি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। তাই বিচার বিভাগের দায়িত্ব হলো সেই অঙ্গীকারকে সমুন্নত রাখা।