রেমিট্যান্সে ভরসা, তবু প্রবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক এডিবি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি খাতের দুর্বল গতি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে ২০২৭ অর্থবছরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়ে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এডিবির ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করছে। তবে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির বিষয়ে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশেই থাকতে পারে, যা এপ্রিলের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ২০২৭ অর্থবছরে তা সামান্য কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামার সম্ভাবনা থাকলেও, এটি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
এডিবির মতে, সম্প্রতি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন ব্যয়, ইউটিলিটি সেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়ছে। পাশাপাশি উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, বিনিময় হারজনিত চাপ এবং খাদ্য ও সেবা খাতের মূল্যস্ফীতি বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফিরতে দিচ্ছে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স ও সেবা খাত ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ফলে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় সীমিত হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানির দুর্বল প্রবণতা, আমদানির ধীরগতি এবং শ্লথ বেসরকারি বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ সৃষ্টি করছে।
এডিবি আরও উল্লেখ করেছে, উৎপাদন খাত উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও কাঠামোগত সমস্যার মুখে রয়েছে। অন্যদিকে কৃষি খাত সার সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর প্রশাসনের সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ এবং সুশাসন জোরদার হলে অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে কয়েকটি বড় ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে, যার প্রভাব মূল্যস্ফীতি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়বে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, উন্নত দেশগুলোর শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, বিনিময় হারের চাপ, কঠোর বৈশ্বিক অর্থায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ আগামী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি হয়ে থাকতে পারে।